মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বের সব ভাষাভাষী মানুষ ও জাতিগোষ্ঠীর প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। একুশে ফেব্রুয়ারি ঘিরে দেওয়া তাঁর এই বার্তায় উঠে এসেছে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, বাঙালির আত্মপরিচয় এবং ভাষার মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাতৃভাষা বাংলা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের আত্মার ভাষা। তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সব শহীদকে, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি মাতৃভাষার অধিকার এবং জাতিসত্তার দৃঢ় ভিত্তি।
একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাতীয় জীবনের এক অনন্য ও আবেগঘন দিন। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় জীবন দেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেক অজানা-অচেনা বীর সন্তান। তাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ। কিন্তু সেই রক্তই হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার প্রথম সোপান।
ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ছিল না। এটি ছিল স্বাধিকার, গণতন্ত্র এবং সাংস্কৃতিক মুক্তির লড়াই। ভাষার প্রশ্ন থেকেই বাঙালির রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত হয়। ধীরে ধীরে সেই চেতনা রূপ নেয় স্বাধীনতার আন্দোলনে। একুশের রক্তাক্ত পথ ধরেই আমরা পৌঁছাই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এবং অর্জন করি স্বাধীন বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রী তার বার্তায় বলেন, বাংলা ভাষা আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রধান বাহন। আমরা যে বাঙালি, আমাদের ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি—সবকিছুর মূল শিকড় এই ভাষায়। ভাষা হারালে জাতির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে। তাই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করা মানে নিজের পরিচয়কে অটুট রাখা।
ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এসেছে যখন UNESCO ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এই স্বীকৃতি শুধু বাংলাদেশের জন্য গর্বের নয়, এটি বিশ্ববাসীর জন্য একটি বার্তা—প্রতিটি ভাষাই গুরুত্বপূর্ণ, প্রতিটি ভাষার রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক মূল্য।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ বিশ্বজুড়ে ভাষার অধিকার ও সংরক্ষণের প্রতীক। পৃথিবীতে হাজারো ভাষা আছে, যার অনেকগুলোই বিলুপ্তির পথে। একুশের চেতনা আমাদের শেখায়, ছোট হোক বা বড়—প্রতিটি ভাষার মর্যাদা সমান।
প্রধানমন্ত্রী আহ্বান জানান, বিশ্বের সব জাতিগোষ্ঠী যেন নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে আরও সচেতন হয়। ভাষা শুধু শব্দের সমষ্টি নয়, এটি একটি জাতির স্মৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারার প্রতিফলন। ভাষা হারিয়ে গেলে হারিয়ে যায় একটি সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, একুশের মূল চেতনা ছিল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জনগণের অধিকার এবং সমতা প্রতিষ্ঠা। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি শিখেছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। সেই শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক।
তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের পথ পেরিয়ে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান সরকার গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত ও শক্তিশালী করতে বদ্ধপরিকর। ভাষা শহীদ এবং স্বাধীনতার জন্য আত্মদানকারী সব শহীদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও মানবিক রাষ্ট্র গড়াই সরকারের লক্ষ্য।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন—প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে আত্মত্যাগের ইতিহাস। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা শুধু অতীত স্মরণ করেই থেমে থাকতে পারি না। শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন আমাদের কাঁধে।
নতুন প্রজন্মকে ভাষার ইতিহাস জানতে হবে, ভাষার মর্যাদা বুঝতে হবে। প্রযুক্তির এই যুগে বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার, চর্চা ও প্রসার নিশ্চিত করা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন—সব জায়গায় শুদ্ধ ও যথাযথ বাংলা ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশে রয়েছে বহু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা। এসব ভাষাও আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ। প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান, দেশে বিদ্যমান ভাষা বৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা চালু রাখা, আঞ্চলিক ভাষার গবেষণা ও নথিভুক্তকরণ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চায় উৎসাহ প্রদান—এসব পদক্ষেপ ভাষা সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভাষা বাঁচলে সংস্কৃতি বাঁচবে, সংস্কৃতি বাঁচলে জাতি টিকে থাকবে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বজুড়ে সব ভাষাভাষী মানুষের প্রতি শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, আসুন আমরা সবাই মিলে ভাষার মর্যাদা রক্ষা করি। কোনো ভাষা যেন অবহেলায় হারিয়ে না যায়। ভাষাগত বৈচিত্র্যই পৃথিবীকে করেছে রঙিন ও সমৃদ্ধ।
একটি ভাষা বিলুপ্ত হওয়া মানে একটি চিন্তাধারা হারিয়ে যাওয়া। তাই ভাষা সংরক্ষণ শুধু সাংস্কৃতিক দায়িত্ব নয়, এটি মানবিক দায়িত্বও বটে।
বার্তার শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী সব ভাষা শহীদের মাগফেরাত কামনা করেন। তিনি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে গৃহীত সব কর্মসূচির সফলতা কামনা করেন।
একুশ আমাদের শিখিয়েছে মাথা নত না করতে। অন্যায়ের কাছে আপস না করতে। নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাহসী হতে। এই চেতনা হৃদয়ে ধারণ করেই এগিয়ে যেতে হবে আগামীর বাংলাদেশ।
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস শুধু একটি স্মরণ দিবস নয়; এটি আত্মপরিচয়ের পুনর্জাগরণ, গণতন্ত্রের অঙ্গীকার এবং ভাষার মর্যাদা রক্ষার শপথ। ভাষা শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় হলো তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলা—যেখানে থাকবে সমতা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং ভাষার সম্মান।



