শীতের আমেজ এখনও পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। ভোরবেলা বাইরে বেরোলেই গায়ে হালকা ঠান্ডার শিরশিরানি টের পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে জেলার দিকে সকাল ও রাতের দিকে শীতের উপস্থিতি স্পষ্ট। কিন্তু এর মাঝেই আবহাওয়ায় আসছে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। আগামী সপ্তাহেই রাজ্যের একাধিক জেলায় বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এমনটাই জানিয়েছে ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর।
চলুন সহজ করে বুঝে নেওয়া যাক, ঠিক কী ঘটতে চলেছে আকাশে আর তার প্রভাব কেমন হতে পারে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে।
আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া আগের নিম্নচাপ ধীরে ধীরে শক্তি হারাচ্ছে। তবে সেটাই শেষ নয়। একই সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন ভারত মহাসাগর এলাকায় নতুন করে একটি নিম্নচাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
এই নতুন সিস্টেমের গতিপথ উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিকে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এটি পূর্ব ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের দিকে অগ্রসর হয়ে আরও শক্তিশালী হতে পারে। আর এই সিস্টেমের প্রভাবেই বাংলার আবহাওয়ায় বদল আসবে বলে মনে করছে আবহাওয়া দপ্তর।
ভাবুন তো, হালকা শীতের সকালে যখন চা হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন, ঠিক তখনই যদি মেঘ জমে বৃষ্টি নামে—পরিস্থিতিটা ঠিক সেরকমই হতে পারে আগামী সপ্তাহে।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে উপকূল সংলগ্ন জেলাগুলিতে। সোমবার ও মঙ্গলবার হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে সেখানে। সমুদ্র উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় আকাশ মেঘলা থাকতে পারে এবং দমকা হাওয়া বইতে পারে।
শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, প্রতিবেশী ওড়িশা এবং সংলগ্ন উপকূলবর্তী এলাকাতেও একই রকম আবহাওয়ার পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
যারা মাছ ধরার কাজে সমুদ্রে যান বা উপকূলের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তাদের জন্য এই সতর্কবার্তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিম্নচাপ শক্তিশালী হলে সমুদ্রের অবস্থা উত্তাল হতে পারে।
বৃষ্টির সম্ভাবনার পাশাপাশি আরেকটি বড় পরিবর্তন আসছে তাপমাত্রায়। ধীরে ধীরে পারদ ঊর্ধ্বমুখী হবে। অর্থাৎ, শীতের কনকনে ভাব আর খুব বেশি দিন টিকবে না।
শুক্রবার থেকে রবিবারের মধ্যে কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় তাপমাত্রা ২০ থেকে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে। উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে তাপমাত্রা থাকবে ১৯ থেকে ২১ ডিগ্রির মধ্যে।
মানে কী দাঁড়াচ্ছে? সকালে হালকা সোয়েটার পরার প্রয়োজন থাকলেও দুপুরে হয়তো আর ততটা ঠান্ডা লাগবে না। অনেকেই ইতিমধ্যেই বলছেন, “শীত বুঝি বিদায় নিতে শুরু করেছে!”
শুধু দক্ষিণবঙ্গ নয়, উত্তরবঙ্গেও তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়বে। সপ্তাহের শেষে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ—দুই তাপমাত্রাই কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।
দার্জিলিং ও সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় তাপমাত্রা আগামী কয়েকদিন ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করবে। শীত সেখানে এখনও টিকে থাকলেও আগের মতো কনকনে নয়।
কালিম্পং ও আশপাশের সমতল সংলগ্ন এলাকায় তাপমাত্রা থাকবে ১১ থেকে ১৫ ডিগ্রির মধ্যে। আর শিলিগুড়ি, মালদহ ও সংলগ্ন জেলাগুলিতে পারদ থাকবে ১৬ থেকে ১৯ ডিগ্রির মধ্যে।
যারা পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য এই তথ্য কাজে লাগতে পারে। খুব ভারী শীতের পোশাক না নিলেও চলবে, তবে হালকা গরম জামা সঙ্গে রাখা ভালো।
অনেকেই ভাবছেন, শীত না কাটতেই হঠাৎ বৃষ্টির সম্ভাবনা কেন? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে সমুদ্রের উপর তৈরি হওয়া নিম্নচাপ ও বায়ুমণ্ডলের চলাচলে।
যখন বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরি হয়, তখন সেটি আশপাশের এলাকা থেকে জলীয় বাষ্প টেনে নেয়। সেই আর্দ্রতা বাতাসে ভেসে এসে মেঘ তৈরি করে। যদি সিস্টেম শক্তিশালী হয়, তাহলে সেই মেঘ বৃষ্টির রূপ নেয়।
এই মুহূর্তে যে নতুন নিম্নচাপ তৈরি হচ্ছে, সেটি উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিকে এগোলে তার প্রভাব পড়বে বাংলার উপর। ফলে হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই বৃষ্টি কৃষকদের জন্য মিশ্র প্রভাব ফেলতে পারে। যেসব এলাকায় রবি শস্য চাষ হচ্ছে, সেখানে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে কিছু সমস্যা হতে পারে। আবার কোথাও কোথাও হালকা বৃষ্টি মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্যও করতে পারে।
শহরের মানুষের জন্য বৃষ্টি মানে ট্রাফিকের ঝামেলা, রাস্তায় জল জমা এবং অফিস যাতায়াতে অসুবিধা। তাই আগে থেকেই প্রস্তুত থাকাই ভালো।
ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে রাখা, আবহাওয়ার আপডেট নিয়মিত দেখা—এই ছোট ছোট প্রস্তুতি অনেক ঝামেলা কমাতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শীত এখনও পুরোপুরি বিদায় নেয়নি, তবে তার দাপট কমছে। একইসঙ্গে নিম্নচাপের জেরে আগামী সপ্তাহে বাংলার বিভিন্ন জেলায় হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
উপকূলবর্তী এলাকায় বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি। তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়বে। উত্তরবঙ্গেও শীত কিছুটা কমতে পারে।
আবহাওয়া সবসময়ই পরিবর্তনশীল। তাই নির্দিষ্ট দিনে বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে সর্বশেষ পূর্বাভাস দেখে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ আকাশের মেজাজ বদলাতে সময় লাগে না।
এই মুহূর্তে যা স্পষ্ট, তা হলো—শীতের নরম আমেজের মাঝেই বৃষ্টি এসে চমক দিতে পারে বাংলাকে। তাই প্রস্তুত থাকুন, আর আবহাওয়ার খোঁজ রাখুন নিয়মিত।



