ওভাল টেস্টের দ্বিতীয় দিন ছিল টানটান উত্তেজনায় ভরা। একদিকে ইংল্যান্ড তাদের চেনা ধাঁচে ‘বাজ়বল’ কৌশলে ঝড় তুলছিল, অন্যদিকে ভারত হারানো দিশা ফিরে পেতে মরিয়া। মহম্মদ সিরাজ এবং প্রসিদ্ধ কৃষ্ণের দুরন্ত বোলিং দ্বিতীয় ইনিংসের আগে ভারতকে ম্যাচে ফেরায়। দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে ভারতের সংগ্রহ ৭৫/২, এগিয়ে ৫২ রানে।
প্রথম ইনিংসে ভারতের ব্যাটিং বিপর্যয়
ভারত দ্বিতীয় দিনের শুরু করেছিল মাত্র চারটি উইকেট হাতে নিয়ে। করুণ নায়ার এবং ওয়াশিংটন সুন্দর ক্রিজে থাকলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী লড়াই তাঁরা দিতে পারেননি। করুণ দিনের তৃতীয় ওভারেই জশ টংয়ের সোজা বল বুঝতে না পেরে এলবিডব্লিউ হন। ওয়াশিংটনও তাড়াতাড়ি ফিরে গেলে ভারতের ইনিংস শেষ হয়ে যায় মাত্র ২০ রান যোগ করে। ফলে প্রথম ইনিংসে ভারতের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২২৪ রান।
ভারতের লোয়ার অর্ডারের এই ভঙ্গুরতা বর্তমান সিরিজে বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে উঠেছে। ইংল্যান্ডের লোয়ার অর্ডার যেখানে প্রায় প্রতিটি ম্যাচে ব্যাট হাতে অবদান রাখছে, সেখানে ভারতের নিচের দিকের ব্যাটাররা যেন ব্যাট ধরতেই ভুলে গেছেন।
ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে ‘বাজ়বল’ এবং ভারতীয় বোলারদের বিপর্যয়
ইংল্যান্ডের ইনিংস শুরু হয়েছিল অত্যন্ত আগ্রাসী ভঙ্গিতে। জ়াক ক্রলি এবং বেন ডাকেট শুরু থেকেই সিরাজ এবং আকাশদীপকে লক্ষ্য বানান। মাত্র ১৫ ওভারেই স্কোর পৌঁছে যায় তিন অঙ্কে। ভারতের বোলিংয়ের দিশাহীনতা তখন চোখে পড়ার মতো। অফস্টাম্পে ফিল্ডার রেখেও লেগস্টাম্পের দিকে বল করাটা ছিল একেবারে অদ্ভুত।
মাঝের সেশনেই ম্যাচে ফেরে ভারত। সিরাজ প্রথমে অলি পোপ, এরপর জো রুট এবং জেকব বেথেল-কে ফিরিয়ে ইংল্যান্ডের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। রুটের আউট ছিল এক কথায় দুর্দান্ত— অফস্টাম্পের বাইরে পড়ে বল ভেতরে ঢুকে এলবিডব্লিউ করল রুটকে।
প্রসিদ্ধ কৃষ্ণও এই ইনিংসে দুর্দান্ত ভূমিকা নেন। চারটি উইকেট নিয়ে তিনিও জানান দেন নিজের সক্ষমতা। সিরাজ এবং প্রসিদ্ধ দুজনেই ৪টি করে উইকেট নেন, যা ইংল্যান্ডকে মাত্র ২৪৭ রানে থামিয়ে দেয়। ক্রিস ওকস ব্যাটে নামতে না পারায় স্কোরে প্রভাব পড়ে।
ভারতের দ্বিতীয় ইনিংস: যশস্বীর আগ্রাসন, রাহুলের ধীরগতি, আকাশদীপের রক্ষাকারী ভূমিকা
দ্বিতীয় ইনিংসে ভারত ব্যাট করতে নামে দিনের শেষদিকে। যশস্বী জয়সওয়াল আক্রমণাত্মক ব্যাটিং শুরু করলেও কেএল রাহুল ছিলেন সতর্ক। রাহুলের ব্যাটিংয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাব স্পষ্ট ছিল। তিনি মাত্র ৭ রানে আউট হন জশ টংয়ের বলে।
সাই সুদর্শন প্রথম ইনিংসে অর্ধশতরান করলেও দ্বিতীয় ইনিংসে ভুগেছেন। রিভিউ অপচয় করে শেষ বেলায় আউট হয়ে ভারতকে কিছুটা বিপদে ফেলেন। শেষ দিকে শুভমন গিল না নেমে নৈশপ্রহরী আকাশদীপ-কে পাঠানো হয় যিনি ৪ রানে অপরাজিত আছেন। যশস্বী অপরাজিত ৫১ রানে রয়েছেন।
ইংল্যান্ডের ফিল্ডিংয়ের ব্যর্থতা: ক্যাচ ফেলা এবং সুযোগ নষ্ট
ভারতের দ্বিতীয় ইনিংসে ইংল্যান্ড ফিল্ডিংয়ে বেশ কয়েকটি সহজ সুযোগ নষ্ট করে। যশস্বী এবং সুদর্শনের ক্যাচ ফেলা ইংল্যান্ডের খরচা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের ভুলই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। দুটি নিশ্চিত ক্যাচ মিস এবং একাধিক রান আউটের সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় চাপ বাড়ে ইংল্যান্ডের উপর।
আবহাওয়া ও আলো নিয়েও নাটক: দ্বিতীয় দিনের শেষবেলায় খেলা বন্ধ
স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭.২০ নাগাদ আলো এতটাই কমে যায় যে আম্পায়াররা স্পিনারদের দিয়ে খেলা চালানোর প্রস্তাব দেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক পোপকে। তিনি রাজি না হওয়ায় খেলা বন্ধ হয়ে যায়। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত দেড় ঘণ্টা খেলা চালানোর কথা থাকলেও আবহাওয়ার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
বোলিং কৌশল ও কোচিং নিয়ে প্রশ্ন
ভারতের বোলিং কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষত, অফস্টাম্পে ফিল্ডার রেখে লেগস্টাম্পে বল করা, এবং সময়মতো ফিল্ড পরিবর্তন না করা, এসব নিয়েই সমালোচনা শুরু হয়েছে। বোলিং কোচ মর্নি মর্কেলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শুভমন গিলের নেতৃত্বেও যথেষ্ট আগ্রাসন বা পরিকল্পনা দেখা যায়নি, যা দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছে।
তৃতীয় দিনের জন্য সম্ভাব্য চিত্র: কতটা এগোতে পারবে ভারত?
ভারত এখন পর্যন্ত ৫২ রানে এগিয়ে। তৃতীয় দিনে দলের মূল লক্ষ্য থাকবে রান বাড়ানো এবং উইকেট না হারানো। যশস্বীর ফর্ম, গিলের প্রত্যাবর্তন, সুন্দর-আকাশদীপদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ইংল্যান্ডের বোলারদের মধ্যে টং এবং ওভারটন ইতিমধ্যে স্নায়ুচাপ সৃষ্টি করেছেন। তবে পিচের আচরণ এবং আবহাওয়াও বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।
ম্যাচে সমতা, কিন্তু ভারত খানিকটা এগিয়ে
প্রথম ইনিংসে ২৩ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় দিনের শেষে ৫২ রানে এগিয়ে ভারত নিঃসন্দেহে ম্যাচে ফিরে এসেছে। মহম্মদ সিরাজ ও প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ যে প্যাশন ও আগ্রাসনের সঙ্গে বল করেছেন, তা দলকে প্রেরণা জুগিয়েছে। এখন দেখার, তৃতীয় দিনে ভারত রান বাড়িয়ে ইংল্যান্ডকে বড় লক্ষ্য দিতে পারে কি না।


