সমুদ্রস্নান আর প্রাণহানির করুণ পরিসংখ্যান
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু এই আকর্ষণীয় সৈকত এখন মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই শুধুমাত্র সৈকতে গোসলে নেমে ১২ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থান, বিশেষ করে কুতুবদিয়া, উখিয়া ও রামু উপজেলায়, আরও ৫০ জনের বেশি মানুষ পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন।
এই তথ্য জানিয়েছে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)—যারা দীর্ঘদিন ধরে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার কমাতে কাজ করছে।
২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সৈকতে ডুবে মৃত ৬৪ জন
সি সেইফ প্রকল্পের মাঠ কর্মকর্তা ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে ৬৪ জনের। এদের প্রত্যেকেই সৈকতে গোসল করতে নেমে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারান। তবে আশার বিষয় হলো, একই সময়ে ৭৯৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে সি সেইফ প্রকল্পের লাইফগার্ড দল।
লাইফগার্ড সংকট: পর্যটকের তুলনায় অপ্রতুল জনবল
সৈকতে যতজন পর্যটক প্রতিদিন ভ্রমণে আসে, সেই তুলনায় লাইফগার্ড কর্মীর সংখ্যা অত্যন্ত কম। বর্তমানে মাত্র ২৭ জন লাইফগার্ড সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করেন, যারা আবার দুইটি শিফটে ভাগ হয়ে প্রতিদিন মাত্র ১৩ জন করে কাজ করেন।
ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “সরকারি ছুটির দিন বা উৎসবের সময় যখন লক্ষাধিক পর্যটক সৈকতে ভিড় করে, তখন এত কম সংখ্যক লাইফগার্ড দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।”
সাবধানতার অভাবেই বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পর্যাপ্ত সতর্কতা, দিকনির্দেশনা ও গোসলের নির্ধারিত স্থান না থাকায় এই মৃত্যুর ঘটনা বারবার ঘটছে। কোথায় গোসলে নামা যাবে, আর কোথায় নয়—এ বিষয়ে পর্যটকদের সচেতন করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।
সরকারি উদ্যোগের অভাব নিয়ে ক্ষোভ
পর্যটন উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী কলিম উল্লাহ বলেন, “সরকারের উচিত বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নিজস্ব লাইফগার্ড সেবা চালু করা এবং সুনির্দিষ্টভাবে গোসলের এলাকা চিহ্নিত করে দেওয়া।”
ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকলেও তারা নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ন্যূনতম উদ্যোগ নিচ্ছেন না। বরং, তারা কেবল বাণিজ্যিক দিকেই মনোযোগী।”
প্রশাসনের জবাবদিহির ঘাটতি
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাফিস ইনতেসার নাফি জানিয়েছেন, “একটি বেসরকারি সংস্থা কাজ করছে। আমরা তাদের ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ও অন্যান্য উন্নয়নমূলক বিষয়ে চিন্তা করছি।” কিন্তু এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো সরকারি পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
পানি-ডুবিতে মৃত্যুর জাতীয় চিত্র আরও উদ্বেগজনক
জাতিসংঘের হিসাবে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী ২,৩৫,০০০ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশে বছরে ১৯,০০০ জন প্রাণ হারায়। অর্থাৎ, প্রতিদিন ৫০ জন মারা যায়, যার মধ্যে প্রায় ৪০ জনই শিশু। এই পরিসংখ্যান আরও একবার প্রমাণ করে, পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি কেবল সমুদ্র সৈকতে নয়, বরং এটি একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট।
নিরাপদ সৈকত ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়
বিশেষজ্ঞ এবং সচেতন মহলের মতে, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে দুর্ঘটনা রোধে যেসব পদক্ষেপ জরুরি:
- সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষিত ও পর্যাপ্ত সংখ্যক লাইফগার্ড নিয়োগ
- সৈকতের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক চিহ্ন বসানো
- গোসলের নির্ধারিত এলাকা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ
- পর্যটকদের সচেতন করতে মিডিয়া ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচার অভিযান
- সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটিকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল করা
কক্সবাজারে পর্যটন হোক নিরাপদ, মৃত্যু নয়
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারকে ঘিরে পর্যটন অর্থনীতি প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সফল করতে হলে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে পর্যটকদের নিরাপত্তা। বারবার ডুবে মৃত্যুর ঘটনা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি জাতীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
পর্যটন হোক নিরাপদ, প্রাণহানি নয়—এই স্লোগানকে সামনে রেখে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখনই উচিত দ্রুত, কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করা। যাতে করে কক্সবাজার শুধু একটি জনপ্রিয় গন্তব্যই নয়, হয়ে ওঠে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পর্যটনের আদর্শ।


