বাংলাদেশে মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা বাড়ার ফলে সোমবার (৫ আগস্ট) থেকে চারটি বিভাগে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা তীব্রতর হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এর মধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে বৃষ্টির প্রকোপ তিন থেকে চার দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
এই সময়ে ঢাকাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগেও বৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে রংপুর অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা: বৃষ্টিপাত বৃদ্ধির প্রধান কারণ
আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবীর জানিয়েছেন,
“মৌসুমি বায়ু দেশের উত্তরাঞ্চলে সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যার কারণে বৃষ্টিপাত বাড়ছে।”
তিনি আরও বলেন,
“আগামী তিন থেকে চার দিন উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।”
এই বৃষ্টিপাতের প্রভাবে কিছু অঞ্চলে সাময়িক জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন, কিংবা ভারি বর্ষণে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
কোথায় কেমন থাকবে বৃষ্টির পূর্বাভাস?
আবহাওয়া অধিদপ্তর তাদের পূর্বাভাসে জানিয়েছে,
- রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
- ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক স্থানে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
- উত্তরাঞ্চলের কিছু কিছু স্থানে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
এ সময় বজ্রপাতের প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে, তাই খোলা মাঠে অবস্থান, বৃক্ষের নিচে আশ্রয়, এবং নদীতে যাতায়াত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম: পাহাড়ি ঢলের প্রভাব
রোববার দুপুর ১২টায়, দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
এর প্রধান কারণ হলো—
- উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল
- একটানা ভারী বৃষ্টিপাত
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যে জানানো হয়:
নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন,
“পানি কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, তবে এখনো বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার বলেন,
“উজান থেকে প্রচুর পানি আসছে, আর স্থানীয়ভাবে টানা বৃষ্টি চলছে। আমরা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছি।”
উত্তরাঞ্চলে বন্যার শঙ্কা কতটা বাস্তব?
যদিও এখন পর্যন্ত তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার, কিন্তু আবহাওয়ার যে পূর্বাভাস, তা চিন্তার কারণ হতে পারে।
যদি ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল একইসাথে চলতে থাকে, তাহলে—
- তিস্তা ছাড়াও ধরলা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বাড়তে পারে
- লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও রংপুর জেলায় আংশিক প্লাবন দেখা দিতে পারে
- নিম্নাঞ্চলগুলোয় পানি জমে কৃষি জমির ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে
নাগরিকদের জন্য করণীয় ও সতর্কতা নির্দেশনা
এই আবহাওয়ায় নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষদের জন্য কিছু সতর্কতা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করা জরুরি—
করণীয়:
- যেসব এলাকায় নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও ওষুধ সংরক্ষণ করুন
- স্কুল ও সরকারি ভবনগুলো আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখুন
- বন্যার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ইউপি বা পৌরসভা পর্যায়ে আগাম সতর্কবার্তা জারি করা হোক
- শিশুসহ পরিবারকে উঁচু ও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হোক
কী এড়িয়ে চলবেন:
- নদী পারাপার বা মাছ ধরার সময় সতর্ক থাকুন
- বিদ্যুৎ সংযোগযুক্ত স্থান বা পানিতে ভেজা অবস্থায় ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করবেন না
- গুজব কিংবা ভুয়া বার্তার প্রভাব থেকে দূরে থাকুন, বরং সরকারি তথ্যসূত্র অনুসরণ করুন
পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাসে প্রযুক্তির ব্যবহার
আবহাওয়া অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ড আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নদীর পানিপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও মেঘসঞ্চার পর্যবেক্ষণ করছে।
এর ফলে জনগণকে আগেভাগেই সতর্কতা জারি করা সম্ভব হচ্ছে।
বর্তমানে BMD (Bangladesh Meteorological Department) এর মাধ্যমে অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে:
- লাইভ রেইনফল আপডেট
- রাডার ইমেজ
- বন্যা পূর্বাভাস মানচিত্র
চলমান বৃষ্টির ইতিবাচক দিকও রয়েছে
যদিও বৃষ্টি অস্থায়ী সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, তবে এতে রয়েছে কৃষিতে ইতিবাচক প্রভাব। বিশেষ করে—
- রোপা আমনের জমিতে পানির প্রয়োজন মিটবে
- খাল-বিল-নদীর পানির স্তর স্বাভাবিক হবে
- গরমের তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পাবে
তবে এই বৃষ্টি যদি মাত্রাতিরিক্ত হয়, তখন ফসলের ক্ষতি, রাস্তাঘাটের ধস, এবং জনদুর্ভোগ বেড়ে যেতে পারে।


