অমৃতবাজার—এই নামটি শুধুমাত্র একটি গ্রামের পরিচায়ক নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে সাংবাদিকতার সাহসিকতা, ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ ও জাতীয় চেতনার প্রতীক। কালের স্রোতে আজ হয়তো অনেকে নামটি ভুলে গেছেন, কিন্তু ইতিহাসের গহীন খোঁজ করলে বারবার ফিরে আসে শিশির কুমার ঘোষ, অমৃতময়ী দেবী, এবং সেই বিপ্লবী সংবাদপত্র ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-এর নাম।
যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার মাগুরা ইউনিয়নে অবস্থিত ছোট্ট গ্রাম অমৃতবাজার, কপোতাক্ষ নদীর তীরে ঘেরা এক অপার নৈসর্গিক আবেশে ভরা জনপদ। সরু মেঠোপথ, পল্লীজীবনের নিরবতা আর সবুজ ফসলের মাঠ এই গ্রামকে একটি জীবন্ত ঐতিহাসিক স্মারক করে তোলে।
এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে প্রকৃতি ও প্রতিরোধ একসূত্রে মিশে গেছে। কপোতাক্ষ নদীর কলধ্বনি যেন আজও বহন করে নিয়ে আসে সেই সাহসী কণ্ঠস্বর, যা একসময় প্রতিবাদী শব্দ হয়ে ছাপা হতো সংবাদপত্রের পাতায়।
শিশির কুমার ঘোষ, অমৃতবাজার গ্রামের সন্তান, ছিলেন ঊনবিংশ শতকের জাতীয়তাবাদী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। তাঁর বাবা হরি নারায়ণ ঘোষ এবং মা অমৃতময়ী দেবী ছিলেন শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা। মায়ের নামে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করে তার নাম দেন ‘অমৃতবাজার’, যা পরবর্তীতে এক বিপ্লবী পত্রিকারও নাম হয়ে ওঠে।
ঘোষ পরিবারের সদস্যরা ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক। সাংবাদিকতাকে তাঁরা ব্যবহার করেছেন প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে, আর অমৃতবাজার পত্রিকা হয়ে ওঠে সেই লড়াইয়ের মুখপত্র।
১৮৬৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি, মাত্র ৩২ টাকার একটি কাঠের হ্যান্ডপ্রেসে যশোরের অমৃতবাজার গ্রাম থেকে প্রকাশিত হয় পত্রিকার প্রথম সংখ্যা। লক্ষ্য ছিল একটাই—নীল চাষিদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা।
শুরুর দিকে সাপ্তাহিক হলেও ১৮৭১ সালে পত্রিকাটি কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়, এবং বাংলা ও ইংরেজিতে প্রকাশ হতে থাকে। এই পত্রিকাই ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করার প্রথম সাহসী প্রচারমাধ্যম হয়ে ওঠে।
১৮৭৮ সালে, ‘ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট’ নামের একটি নিষ্ঠুর আইন পাশ হয়, যার লক্ষ্য ছিল দেশীয় ভাষার পত্রপত্রিকাগুলিকে নিয়ন্ত্রণে আনা। কিন্তু এই আইন প্রণয়নের অন্যতম কারণ ছিল অমৃতবাজার পত্রিকা’র সাহসী রিপোর্টিং।
এই আইনের প্রভাবে পত্রিকাটি সম্পূর্ণরূপে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হতে থাকে, যাতে আইনটি এড়িয়ে যাওয়া যায়। এটি ইতিহাসে দ্বিতীয় এমন পত্রিকা, যা শাসকের বিরুদ্ধে গিয়ে তার প্রকাশনা কৌশলে পরিবর্তন এনে স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার বজায় রেখেছিল।
১৮৯১ সালে, ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ দৈনিক রূপে প্রকাশিত হয়, এবং এটি হয় ভারতীয় মালিকানাধীন প্রথম অনুসন্ধানী সংবাদপত্র। পত্রিকাটি তার ইতিহাসে অনেক ঐতিহাসিক সংবাদ ফাঁস করে দেশবাসীকে আন্দোলিত করেছিল।
বিশেষ করে ভাইসরয়ের গোপন চিঠিপত্র প্রকাশ, কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ইস্যু, বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন—সবক্ষেত্রে এই পত্রিকা ছিল একটি নির্ভীক কণ্ঠস্বর।
শিশির কুমার ঘোষ ও মতিলাল ঘোষ কেবল সম্পাদক ছিলেন না, ছিলেন একেকজন আন্দোলনকারী, যাঁরা সাংবাদিকতাকে রণকৌশলের মর্যাদা দিয়েছিলেন।
১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়, পত্রিকাটি তিন দিন ধরে সম্পাদকীয় অংশ ফাঁকা রেখে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়—সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার।১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট, ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণার দিন, পত্রিকাটি প্রকাশ করে ঐতিহাসিক সম্পাদকীয়ঃ
“এই হল ভোর, যদিও এটা মেঘাচ্ছন্ন। বর্তমানে সূর্যালোক একে ভাঙবে।” এই বাক্য শুধু একটি লাইন নয়, এটি ছিল একটি নতুন দিনের প্রতিশ্রুতি, একটি জাতির জন্মঘোষণা।

১৯৯১ সালে, অমৃতবাজার পত্রিকা’র মুদ্রণ বন্ধ হয়ে যায়। তবে ইতিহাস থেকে তা কখনো মুছে যায়নি। নেহেরু মেমোরিয়াল মিউজিয়াম ও ন্যাশনাল সায়েন্স সেন্টারে সংরক্ষিত আছে পত্রিকাটির ছাপার যন্ত্র এবং প্রাচীন সংখ্যা।বর্তমানে বিভিন্ন ডিজিটাল আর্কাইভিং প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে এক বিপ্লবী সাংবাদিকতার ইতিহাস।
অমৃতবাজার গ্রাম, অমৃতময়ী দেবীর নাম, কপোতাক্ষ নদী এবং শিশির কুমার ঘোষ—এই সবকিছুর মেলবন্ধন একটি বৃহৎ জাতীয় আখ্যান রচনা করে। একটি পত্রিকার জন্ম হয় একটি মা’র স্মৃতি থেকে, আর সেটি হয়ে ওঠে জাতির চেতনার প্রতীক।
এই গ্রাম ও তার ইতিহাস আমাদের শেখায়, সাংবাদিকতা হতে পারে সত্যের অস্ত্র, যেখানে তথ্য নয়, আদর্শই হয় মূল চালিকাশক্তি।
আজকের সাংবাদিকতা যখন বাণিজ্যিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে দোদুল্যমান, তখন অতীতের অমৃতবাজার পত্রিকা আমাদের শেখায়—সাহস থাকতে হয় প্রশ্ন তুলতে,সততা থাকতে হয় সত্য অনুসন্ধানে, আর দায়বদ্ধতা থাকতে হয় জনসেবায়।
শিশির কুমার ঘোষের মতো সাহসী সাংবাদিকেরা আজও প্রেরণা দেন তরুণ প্রজন্মকে, যারা সত্যকে সামনে আনতে চায় ভয়হীনভাবে।
অমৃতবাজার শুধু একটি পত্রিকার নাম নয়, এটি এক আত্মত্যাগের ইতিহাস, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সূচনা এবং জাতীয় চেতনার অবিনাশী স্মারক। এটি প্রমাণ করে—কোনো একটি ছোট্ট গ্রাম থেকেও শুরু হতে পারে একটি মহা আন্দোলন।
আজ আমাদের দরকার সেই আদর্শে ফিরে যাওয়া, যেখানে সংবাদ মানে শুধু নিউজ নয়, বরং সচেতনতা, ন্যায় ও সাহসের সম্মিলন।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: রিফাত-বিন-ত্বহা | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১১ আগস্ট ২০২৫


