মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬
28.4 C
Jessore
More

    ভৈরব নদীর তীরে মুরলীর প্রাচীন জনপদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য

    ভৈরব নদীর তীরে বিস্তৃত মুরলীর প্রাচীন জনপদ একসময় ছিল ইতিহাস, সংস্কৃতি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য সমন্বয়। এখানে নদীর ঢেউয়ের মৃদু কলতান মিশে থাকত বক, পানকৌড়ি ও বুনো হাঁসের ডাকের সঙ্গে। বর্ষার দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্রতায় ভিজে থাকা এই ভূমি মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসে, কৃষি জমিতে এবং নদীর জলে একাকার হয়ে উঠত। বিশাল বাঁশবাগানের ছায়ায় বসত গ্রাম ও গঞ্জ—যেখানে বাতাস বয়ে গেলে বাঁশপাতার মিষ্টি সুর অতীতের গল্প শোনাত।

    মুরলীর মানুষের জীবন ছিল নদী-কেন্দ্রিক। কৃষি, মৎস্য শিকার ও নদী বাণিজ্য ছিল জীবিকার প্রধান উৎস। বর্ষায় নদী ফুলে-ফেঁপে উঠলে এখানে জীবনযাত্রা বদলে যেত—নৌকা হয়ে উঠত প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। শীতে নদীর পানি কমে গেলে চাষাবাদ মেলামেশা প্রাণবন্ত হয়ে উঠত।

    বর্ষা ও শীতের বৈপরীত্য এখানে কেবল ঋতু পরিবর্তনের চিহ্ন নয়, বরং মানুষের জীবনধারার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। বর্ষার স্যাতস্যাতে হাওয়া ও শীতের কুয়াশা মুরলীর প্রতিটি মানুষের মন ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করত।

    কারবালা পুকুরের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত ছিল বিস্তৃত উঁচু ইটের ঢিবি, যা স্থানীয়রা পীর বাহরাম শাহের সমাধি’ নামে চিনত। তবে ইতিহাসবিদদের মতে এটি ছিল এক প্রাচীন বৌদ্ধস্তূপের ধ্বংসাবশেষ। এই দোলমঞ্চ আকৃতির বেদীর পরিধি ছিল প্রায় ২৪ বাই ১৮ ফুট। ধাপে ধাপে নির্মিত নিম্ন বেদীর ওপর ছিল আরও তিনটি ছোট বেদী।

    আরও পড়ুন :  মোঃ তারিকউজ্জামান নান্নু: বাংলাদেশের ক্রীড়া অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নাম

    দক্ষিণ প্রান্তের বাহরাম শাহের কবর সম্ভবত পরবর্তী কালের সংযোজন। এই স্থান ছিল ধর্মীয় ও সামাজিক মিলনমেলা—যেখানে মানুষ শ্রদ্ধা ও কৌতূহল নিয়ে আসত।

    মুরলী থেকে বেশি দূরে নয়, যশোরের বকচর অঞ্চলেও রয়েছে বহু প্রাচীন স্থাপনার চিহ্ন। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা জগন্নাথ দেবের মন্দির আজও সেই প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী। শহরের উপেন্দ্রনাথ কুণ্ডুর গৃহে একসময় রক্ষিত ছিল একটি প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি, যা নিঃশব্দে এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ ইতিহাসের কথা বলে।

    এছাড়াও মুরলীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অসংখ্য দেবালয়, আখড়াহাজী মহসীনের কীর্তিস্মারক মুরগীর ইমামবাড়া—যা আজও মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম চিহ্ন হিসেবে বিদ্যমান।

    মধ্যযুগে মুরলী ছিল সৈন্য নিবাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মৃত্তিকার গর্ভে ছিল একটি সুরক্ষিত কেল্লা, যা আজ আর দৃশ্যমান নয়, তবে ‘কেল্লাবাটি’ নামে স্থানটি মানুষের স্মৃতিতে অমর হয়ে আছে।

    আরও পড়ুন :  যশোরের প্রবীণ রাজনীতিবিদ জাসদ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা অশোক রায় আর নেই

    তুর্ক-আফগান শাসনামলে পীর খান জাহান আলী বারোবাজার থেকে মুরলীতে আসেন। তবে তার আগেই তাঁর দুই শিষ্য—পীর বাহরাম শাহ গরীব শাহ—এ অঞ্চলে ইসলামের তৌহীদ বাণী প্রচার করছিলেন।

    পীর বাহরাম শাহ ও গরীব শাহ তাঁদের অলৌকিক আচার-ব্যবহার মানবিকতার আলো দিয়ে স্থানীয় জনগণের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন। তাদের সান্নিধ্যে বহু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। খান জাহান আলী মুরলীতে একটি ইসলামিক কেন্দ্র স্থাপন করলেও এখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করেননি। তাই তাঁর নামে কোনো মসজিদ বা পুকুর গড়ে ওঠেনি।

    পীর বাহরাম শাহ ও গরীব শাহের আস্তানা ছিল মানুষের ধর্মীয় সামাজিক মিলনস্থল। এখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আশ্রয় পেত। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ তাঁদের এক ঝলক দেখার জন্য ছুটে আসত।

    লোকসমাগম বাড়তে থাকলে আস্তানা সংলগ্ন স্থানটি ধীরে ধীরে জমজমাট বাজারে রূপ নেয়। এখানেই জন্ম নেয় চিরচেনা কসবা’। নদী ও স্থলপথের সুবিধার কারণে এটি পরিণত হয় এক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে।

    আরও পড়ুন :  যশোরের মণিরামপুরে এক কুকুরের কামড়েই আহত অর্ধশতাধিক!

    এখানকার ব্যবসায়ীরা ভৈরব নদীর মাধ্যমে পণ্য পরিবহন করত। ধান, মাছ, কাপড় ও হস্তশিল্প ছিল প্রধান পণ্য। কসবা শুধু বাণিজ্যের নয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও এক মিলনমেলা হয়ে ওঠে।

    তৎকালীন যশোর ছিল এক সজীব জলমগ্ন ভূমি, যার বাতাসে ভাসত বাঁশপাতার ফিসফিসানি, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি এবং দরবেশদের আস্তানার ধূপের সুগন্ধ। এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতির মিলন ঘটেছিল।

    ভৈরব নদীর স্রোতের মতোই এখানে ইতিহাস নীরবে প্রবাহিত হয়েছে যুগের পর যুগ। মানুষের বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান ও শিল্প-সংস্কৃতি এই নদীর জলের মতোই একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।

    আজ মুরলী আধুনিকতার ছোঁয়ায় পরিবর্তিত হলেও, তার অতীতের গৌরব ও ঐতিহ্য এখনও মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত। কারবালা পুকুর, পীর বাহরাম শাহের সমাধি, জগন্নাথ মন্দির, কসবা বাজার—সবই আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

    ভৈরব তীরের এই প্রাচীন জনপদ বাংলার ঐতিহ্য ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ—যেখানে প্রতিটি ইট, প্রতিটি গাছপালা এবং নদীর প্রতিটি ঢেউ যেন অতীতের গল্প বলে যায়।

    লেটেস্ট আপডেট

    যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগ দিলেন কাজী জালাল উদ্দীন

    যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) নতুন রেজিস্ট্রার হিসেবে...

    তীব্র আপত্তির পর সিদ্ধান্ত বদল! ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিয়ে নতুন ঘোষণা ইসির

    নানা সমালোচনা ও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের আপত্তির পর ভোটকেন্দ্রে...

    যশোরের তরুণদের জন্য বড় ঘোষণা: মেধা ও যোগ্যতাই হবে চাকরির একমাত্র শর্ত

    যশোর-৩ (সদর) আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী অনিন্দ্য...

    গোয়ালদাহ বাজারে রাতের অভিযান! বিপুল ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২

    যশোরে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ দুই মাদক কারবারিকে...

    অভয়নগরে যৌথবাহিনীর অভিযান, ঘর থেকে মিলল পেট্রোল বোমা ও দেশীয় অস্ত্র!

    যশোরের অভয়নগরে যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে দেশীয় অস্ত্র, অ্যামুনেশন, চাইনিজ...

    বাছাই সংবাদ

    তীব্র আপত্তির পর সিদ্ধান্ত বদল! ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিয়ে নতুন ঘোষণা ইসির

    নানা সমালোচনা ও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের আপত্তির পর ভোটকেন্দ্রে...

    যশোরের তরুণদের জন্য বড় ঘোষণা: মেধা ও যোগ্যতাই হবে চাকরির একমাত্র শর্ত

    যশোর-৩ (সদর) আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী অনিন্দ্য...

    গোয়ালদাহ বাজারে রাতের অভিযান! বিপুল ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২

    যশোরে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ দুই মাদক কারবারিকে...

    অভয়নগরে যৌথবাহিনীর অভিযান, ঘর থেকে মিলল পেট্রোল বোমা ও দেশীয় অস্ত্র!

    যশোরের অভয়নগরে যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে দেশীয় অস্ত্র, অ্যামুনেশন, চাইনিজ...

    সীমান্তে বড় সাফল্য! বিজিবির হাতে ধরা পড়ল পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলি

    শার্শা উপজেলার বেনাপোল সীমান্তে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে দুটি...

    রাতের ভোট, ডামি প্রার্থী ও কারচুপি: ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বাস্তব গল্প

    বাংলাদেশে নির্বাচন যত কাছে আসে, “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” শব্দটি তত...

    আ’লীগ নেই মাঠে, ভোট যাবে কার ঝুলিতে? মণিরামপুরে জমে উঠছে নির্বাচনী সমীকরণ

    আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যশোর-৫ (মণিরামপুর) সংসদীয়...

    চৌগাছায় নারীকর্মী হেনস্তা! ৬ জনের জরিমানা, আদালতের কড়া সিদ্ধান্ত

    যশোরের চৌগাছায় জামায়াতের নারী কর্মীদের হেনস্তার দুটি ঘটনায় ধানের...

    এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

    জনপ্রিয় ক্যাটাগরি

    Translate »