নড়াইলের শেখহাটি অঞ্চল বাংলার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। ইশপপুর পরগনা কেন্দ্র করে চাঁচড়া অঞ্চলের মহতাবরাম রায় এবং কালীদাস রায়-এর মধ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সামাজিক মর্যাদার লড়াইয়ের এক প্রমাণ। এই সংঘর্ষের ধারাবাহিকতা, নবাবি শাসন থেকে ইংরেজ স্থায়ী বন্দোবস্ত পর্যন্ত বিস্তৃত, যা কেবল স্থানীয় ইতিহাস নয়, বরং গোটা অঞ্চলের সংস্কৃতি ও রাজনীতির রূপান্তরের সাক্ষী।
চাঁচড়া অঞ্চলের মহতাবরাম রায় ইশপপুর পরগনা দখলের জন্য বারবার সামরিক প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু প্রতিবারই কালীদাস রায় তার সুদক্ষ কৌশল ও সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে এই আক্রমণ প্রতিহত করেন।
অবশেষে, যখন মহতাবরাম রায় প্রবল শক্তি নিয়ে আক্রমণ করেন, তখন কালীদাস রায় কূটনৈতিক পথ বেছে নেন। তিনি ঢাকার নবাব কাশিম খাঁ-এর কাছে উপঢৌকন পাঠান এবং বাদশাহ জাহাঙ্গীর-এর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি অর্জন করেন।
এরপর থেকেই কালীদাস রায় “রায় চৌধুরী” উপাধি লাভ করেন এবং স্থানীয় সমাজে “রাজা” হিসেবে সম্মানিত হন।
কালীদাস রায় তার প্রশাসনিক কেন্দ্র সেখহাটি থেকে সরে গিয়ে ভৈরব কুলের বিভাগদি গ্রামে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলেন।
তিনি সেখান থেকে সেখহাটি পর্যন্ত প্রায় ১০-১২ মাইল দীর্ঘ উঁচু রাস্তা নির্মাণ করেন, যা শুধুমাত্র যোগাযোগের সুবিধা নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
যদিও তিনি সেখহাটি ছেড়ে যান, তবে এই অঞ্চল ছিল তার হৃদয়ের নিবাস, যার সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন।
দুইবার বিবাহের মাধ্যমে কালীদাস রায় তার পুত্র-কন্যাদের বিভিন্ন কুলীন ও প্রভাবশালী পরিবারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করেন। এর ফলে তিনি স্থানীয় কুলীন সমাজের মধ্যে “গোষ্ঠীপতি” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
তার কন্যা বাণী সুন্দরী বালীবাড়ির গোসাই দাস বংশে বিবাহের পর বাঘুটিয়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। এই কন্যার নাম অনুসারে প্রতিষ্ঠিত হয় বাণীপুর গ্রাম।
তিনি বাণীপুর ও হরিশপুর মৌজা মৌরসী, মোকররী ও গাতি দান হিসেবে প্রদান করেন।
এছাড়া তার পৌত্রীর সঙ্গে বাগাণ্ডা সমাজের যাদবেন্দ্র বসু-এর বিবাহ হয় এবং তাদের জন্য জঙ্গল বাঁধাল ও তেঘরি গ্রাম ভোগোত্তর স্বরূপ দেওয়া হয়।
জঙ্গল বাঁধালের সুপরিচিত বসু বংশ-এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন যাদবেন্দ্র বসু।
ধর্মপরায়ণ কালীদাস রায় উচ্চশ্রেণীর ব্রাহ্মণ সমাজের জন্য বড়গাতি, সিঙ্গিয়া, সেখহাটি, দেয়াপাড়া, ভূগিলহাট ও শোলপুরসহ প্রায় সতেরো গ্রাম দান করেন।
বড়গাতির একজন প্রখ্যাত পণ্ডিত ছিলেন তার সভাপণ্ডিত, যা তার শিক্ষানুরাগ ও পণ্ডিতপ্রতিপালনের প্রমাণ।
কালীদাস রায়ের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরিরা ১৬১৯ থেকে ১৬৪৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সেখহাটি ও ইশপপুর পরগনা শাসন ও ভোগদখল করেন।
তবে সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। ১৬৯৬ খ্রিষ্টাব্দে চাঁচড়ার রাজা মনোহর প্রবল শক্তি নিয়ে ইশপপুর দখল করেন।
বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলা পতনের পর মীর জাফর নবাবি সিংহাসনে বসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ২৪টি পরগনা দান করেন।
এই পরগনার মধ্যে ছিল হুগলীর ফৌজদার সালাহউদ্দীনের জমিদারী। নবাবের আদেশে সালাহউদ্দীন ইশপপুর দখল করেন।
সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, “Jessore বা Yusefpur নামে পরিচিত জমিদারির একাংশ, Saidpur সহ প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরগনা সালাহউদ্দীনের মালিকানায় যায়।”
ইংরেজ শাসনের সময় লর্ড কর্ণওয়ালিস-এর স্থায়ী বন্দোবস্ত কার্যকর হলে, ইশপপুর পরগনা “খারিজা তালুক” হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং যশোর কালেক্টরির ২০ নং তৌজিভুক্ত হয়।
এই তালুকের বার্ষিক রাজস্ব ছিল ২১৯ টাকা থেকে ২৩৪.১০ টাকা পর্যন্ত, যা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ।
ইশপপুর পরগনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব
ইশপপুর পরগনার ইতিহাস কেবল একটি জমিদারি দখল বা ক্ষমতার পালাবদলের কাহিনি নয়। এটি রাজনৈতিক কৌশল, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় দানশীলতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের সমন্বিত প্রতিচ্ছবি।
কালীদাস রায়ের জীবন ও কর্মকাণ্ড শুধু একজন জমিদারের ইতিহাস নয়, বরং এটি এক সমৃদ্ধ স্থানীয় সমাজব্যবস্থার বিকাশের গল্প।
তার অবদান শেখহাটি অঞ্চলকে শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও সমৃদ্ধ করেছে।
নড়াইলের শেখহাটি ও ইশপপুর পরগনার ইতিহাস আমাদের শেখায় কিভাবে স্থানীয় ক্ষমতা, কূটনীতি, এবং সামাজিক বন্ধন মিলিত হয়ে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করে।
কালীদাস রায়ের সময় থেকে ইংরেজ স্থায়ী বন্দোবস্ত পর্যন্ত এই অঞ্চলের পরিবর্তনগুলি শুধু একটি ভৌগোলিক স্থানের নয়, বরং সমগ্র বাংলার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের প্রতিচ্ছবি।
✍️ তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১২ আগস্ট ২০২৫


