শ্রাবণ মাস এবার যেন একটানা চোখের জলের মতো ঝরেছে। যশোরের মাঠ-ঘাট, জলাশয়, খাল-বিল সবই বৃষ্টির পানিতে ভরে উঠেছে। নিচু জমি ডুবে গেছে, সেখানে আমনের চারা পানিতে নুয়ে পড়ে আর মাথা তুলতে পারেনি। তবুও উঁচু জমির কৃষকরা সবুজ স্বপ্নের ফসল রোপণ করেছেন, আর আজ তাদের ধানের মাঠ যেন আশার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।
যশোরের বহু গ্রামে নিচু জমি পানির নিচে চলে গেছে। শ্রাবণের অবিরাম বৃষ্টিতে এসব জমির ধানের চারা নষ্ট হয়ে গেছে। পানি দীর্ঘদিন জমে থাকার কারণে চারা পচে গেছে এবং কৃষকরা হাল ছেড়ে দিয়েছেন।নিচু জমিতে আমনের চারা নষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।বৃষ্টির তীব্রতা ও সময়কাল এই ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়েছে।
উঁচু জমিতে যারা সময়মতো রোপণ করেছিলেন, তাদের জন্য দৃশ্য একেবারেই ভিন্ন।কচি আমনের চারাগুলো বাতাসে দুলছে।ধানের শীষে কুয়াশার মতো সাদা বুদবুদি জমেছে, যা আসন্ন ফলনের আভাস দিচ্ছে।দূর থেকে এই ক্ষেতগুলো দেখে মনে হয়, প্রকৃতি যেন সবুজ গালিচা বিছিয়ে রেখেছে।এই ক্ষেত শুধু কৃষকের শ্রম ও আশার প্রতীক নয়, বরং গোটা গ্রামকেই প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
যশোরের গ্রামগুলোতে এবার পাটের ফলন ভালো হয়েছে। সারি সারি বান্ডিলে শুকানো পাটের গন্ধে ম ম করছে বাতাস।পাটের দাম বহু বছর পর এতটা ভালো হয়েছে।কৃষকেরা বলছেন, পাট এখন “সোনার দাম”।বাজারে নিলেই বিক্রি হচ্ছে ন্যায্য মূল্যে, যা চাষিদের মুখে সন্তুষ্টির হাসি এনে দিয়েছে।পাট শুধু অর্থনৈতিক লাভ নয়, গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্যকেও নতুন করে ফিরিয়ে এনেছে।
গত কয়েক বছর ধরে মজুরির মূল্য কৃষকের হতাশার কারণ ছিল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।শ্রমিকেরা তাদের কাজের ন্যায্য পারিশ্রমিক পাচ্ছেন।মাঠে ধান রোপণ, পাট শুকানো, আগাছা পরিষ্কার—সব কাজেই মজুরি আগের তুলনায় বেশি।যদিও দিনের শেষে ক্লান্তি থাকে, তবুও শ্রমের সঠিক মূল্য পাওয়ার আনন্দ তাদের মুখে ফুটে উঠছে।
শুধু কৃষিকাজ নয়, বর্ষায় গ্রামের দৃশ্যও যেন এক বিশেষ আবহ তৈরি করে।পুকুরে শাপলা ফুটেছে, তার পাপড়িতে বৃষ্টির জলবিন্দু ঝলমল করছে।সন্ধ্যায় ধানক্ষেতের উপর দিয়ে বকের ঝাঁক উড়ে যায়।কাঁঠাল-আমগাছের ছায়ায় বসে থাকে শিশু ও বৃদ্ধেরা।বৃষ্টির ধোয়া মাটি থেকে উঠে আসে এক শ্যামল কোমলতার সুবাস।
এই বর্ষা একদিকে ধানগাছ ডুবিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে অনেক কৃষকের জন্য ফসলের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ এনে দিয়েছে।প্রকৃতি যেমন ধ্বংস করে, তেমনি আবার নতুন করে গড়ে তোলে।কৃষকরা জানেন, চাষাবাদে ঝুঁকি আছে, কিন্তু প্রতিটি মৌসুমই নতুন করে শুরু করার সম্ভাবনা রাখে।
যশোরের কৃষকেরা প্রমাণ করেছেন, যতই প্রতিকূলতা আসুক, শ্রম আর সাহস থাকলে আশার বীজ অঙ্কুরিত হবেই।কিছু জমি হারালেও তারা নতুনভাবে রোপণের পরিকল্পনা করছেন।পাটের লাভ, ভালো মজুরি, এবং উঁচু জমির ফলন তাদের আগামী মৌসুমের জন্য নতুন উদ্যম দিচ্ছে।
শ্রাবণের বৃষ্টিতে যশোরের কৃষিজীবন যেমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তেমনি আশা ও সম্ভাবনার দরজাও খুলেছে। সবুজ ধানের ক্ষেত, সোনালী পাটের গন্ধ, এবং শ্রমিকের হাসি—সব মিলিয়ে এই বর্ষা হয়ে উঠেছে মাটির, মানুষের ও প্রকৃতির এক যৌথ উৎসব।
✍️ তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১২ আগস্ট ২০২৫


