বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে অনেক গুণী খেলোয়াড়ের নাম আমরা স্মরণ করি, কিন্তু এমদাদুল হক বকুল সেই তালিকায় এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। জলক্রীড়া ও ভলিবল উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর অসামান্য দক্ষতা ও সাফল্য যশোর তথা দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে একটি অনন্য অধ্যায় রচনা করেছে।
১৯৫৮ সালে যশোর জেলার শার্শায় জন্মগ্রহণ করেন এমদাদুল হক বকুল। তাঁর পিতার নাম ছিল মোঃ রবিউল হক। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে বকুল ছিলেন তৃতীয় সন্তান। শৈশব থেকেই তিনি খেলাধুলায় আগ্রহী ছিলেন, এবং এই আগ্রহ পরবর্তীতে তাঁর জীবনকে ক্রীড়া জগতে একটি দৃঢ় অবস্থানে নিয়ে যায়। শিক্ষা জীবনে তিনি এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।
শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই বকুল ক্রীড়াঙ্গনে সক্রিয় ছিলেন। বিশেষ করে বিদ্যালয়ের আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতায় তিনি অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। বরিশালে অনুষ্ঠিত আন্তঃস্কুল জাতীয় প্রতিযোগিতায় উচ্চ লাফে তৃতীয় স্থান অর্জন ছিল তাঁর প্রাথমিক সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
১৯৭৫-৭৬ সালে এমদাদুল হক বকুল যশোর জেলা বার্ষিক সাঁতার চ্যাম্পিয়ন দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন। তাঁর সাঁতার দক্ষতা কেবলই প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি কৌশল, গতি ও সহনশীলতার জন্যও পরিচিত ছিলেন। এই সময়েই তিনি ওয়াটার পোলোতে নিজের দক্ষতা প্রদর্শন শুরু করেন।
১৯৭৫ সালে অনুষ্ঠিত জেলা পর্যায়ের ওয়াটার পোলোর রানার্স আপ দলের সদস্য ছিলেন তিনি। একই টুর্নামেন্টে তাঁকে সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নির্বাচিত করা হয়, যা তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি বহন করে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি জেলা ওয়াটার পোলো দলের নিয়মিত খেলোয়াড় হিসেবে খেলেছেন।
ওয়াটার পোলোর মাঠে তাঁর খেলার ধরণ ছিল আক্রমণাত্মক, কিন্তু একই সাথে সুসংগঠিত। তিনি বল কন্ট্রোল, সঠিক পাসিং ও প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার কৌশলে পারদর্শী ছিলেন।
ওয়াটার পোলোতে সাফল্যের পাশাপাশি এমদাদুল হক বকুল ছিলেন একজন দক্ষ ভলিবল খেলোয়াড়। তিনি যশোরের “স্বর্ণরেণু ক্রীড়া সংস্থা” লীগের চ্যাম্পিয়ন দলের হয়ে খেলেছেন এবং দুবার জেলা দলের সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন।
১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকার “ইস্ট এন্ড ক্লাব” এর প্রথম বিভাগের ভলিবল খেলোয়াড় ছিলেন। এই সময়ে তিনি ঢাকা লিগে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিতি পান। তাঁর সার্ভিং ও স্ম্যাশ কৌশল ছিল দর্শনীয় ও কার্যকর।
খেলোয়াড় জীবনের পাশাপাশি তিনি ভলিবল রেফারি হিসেবেও ক্রীড়াঙ্গনে অবদান রাখেন। বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশন কর্তৃক আয়োজিত ভলিবল রেফারির প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার পর তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়াও, তিনি তরুণ খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ দিতেও সময় ব্যয় করেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা ও কৌশল শেয়ার করে তিনি বহু খেলোয়াড়কে অনুপ্রাণিত করেছেন।
ক্রীড়া জীবনের পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ টেলিফোন বিভাগে চাকরি করতেন। চাকরির ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও খেলায় অংশগ্রহণ করতেন। কাজ ও খেলাধুলার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা তাঁর জীবনযাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল।
এমদাদুল হক বকুল ছিলেন শুধু একজন খেলোয়াড় নন, বরং একজন প্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্ব। খেলাধুলার প্রতি তাঁর একাগ্রতা ও শৃঙ্খলা নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, খেলাধুলা শুধু শারীরিক দক্ষতা নয়, বরং মানসিক দৃঢ়তা ও দলগত চেতনার বিকাশ ঘটায়।
এমদাদুল হক বকুলের ক্রীড়াজীবন যশোর এবং বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। সাঁতার, ওয়াটার পোলো এবং ভলিবল—তিনটি ক্ষেত্রেই তাঁর সাফল্য আমাদের গর্বিত করে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে একজন নিবেদিতপ্রাণ খেলোয়াড় একাধিক খেলায় সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারেন।
তাঁর জীবনের গল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে খেলাধুলার প্রতি অনুপ্রাণিত করবে এবং ক্রীড়া জগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচনে সহায়ক হবে।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১২ আগস্ট ২০২৫


