ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বাংলা ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীনে, যেখানে প্রশাসনিক কার্যক্রম চলতো নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে। রাস্তাঘাট ছিল কাঁচা, বর্ষায় কাদা জমে চলাচল হয়ে যেত দুরূহ। তবুও রাজস্ব সংগ্রহ ও পরিবহনের দায়িত্ব ছিল কঠোরভাবে পালনীয়। যশোর, নীলচাষ ও রাজস্ব আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে, কলকাতার সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে সরাসরি যুক্ত ছিল। এই প্রেক্ষাপটেই শুরু হতো এক কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ অর্থযাত্রা, যা ইতিহাসে “গরুর গাড়িতে রাজস্ব পরিবহন” নামে পরিচিত।
যশোর অঞ্চলে ব্রিটিশ প্রশাসনের নিয়োজিত কর্মকর্তারা নীলচাষের আয়, জরিমানা ও বিভিন্ন কর থেকে সংগৃহীত বিপুল অর্থ জমা রাখতেন। প্রশ্ন ছিল—এই অর্থ নিরাপদে কীভাবে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে পৌঁছানো যাবে?
১৮১০ থেকে ১৮৫২ সাল পর্যন্ত এক কৌশলগত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। অর্থ রাখা হতো মোটা কাপড়ে মোড়ানো কাঠের সিন্দুকে, সিন্দুক রাখা হতো ধাতব ও বাঁশের আস্তরণে মোড়া ট্রেজারি গরুর গাড়িতে, আর তার সঙ্গে থাকতো সশস্ত্র সৈন্যবাহিনী।
যাত্রা শুরু হতো যশোর সদর থেকে। কাফেলার প্রথম গন্তব্য ছিল নাভারনের কাছে বেতনা নদীর পাড়ের যাদবপুর। এখানে অস্থায়ী ক্যাম্প বসানো হতো। ইংরেজ সেনা অফিসার টমাস ম্যাচেলের দিনলিপিতে উল্লেখ আছে, কীভাবে রাতে মশাল জ্বালিয়ে ও পাহারা বসিয়ে সেনারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেন।
কাফেলার মাঝখানে থাকতো ট্রেজারি গাড়ি, যার চারপাশে কড়া পাহারা দিত সৈন্যরা। প্রতিটি ধাপে তারা অবস্থান নিত বৃত্তাকারে, যাতে যেকোনো দিক থেকে হামলা ঠেকানো যায়।
পুরো যাত্রা এক দিনে সম্পন্ন হতো না। প্রতিদিন গড়ে ১৫–২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রমের পর কাফেলা থামত। যাদবপুরের পর বনগাঁ, তারপর আরও পূর্বনির্ধারিত স্থানে বিরতি হতো।
প্রতিটি বিরতিতে নতুন গরুর গাড়ি যোগ দিত, পুরোনো গাড়িগুলো মালপত্র নিয়ে যশোরে ফিরে যেত। এইভাবে রিলে সিস্টেম চালু ছিল, যা পথের ক্লান্তি ও ঝুঁকি কমাত।
রাত ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়। ডাকাতদল, বনের দস্যু ও নদীপথের জলদস্যুরা তখন সক্রিয় থাকতো। সৈন্যরা পালা করে মশাল হাতে পাহারা দিত।
কাফেলার চারপাশে বাঁশের বেড়া তৈরি করা হতো, যাতে হঠাৎ হামলা প্রতিহত করা যায়। আগুন জ্বালিয়ে গরুগুলোকে গরম রাখা ও বন্যপ্রাণী দূরে রাখা হতো।
ঐ সময়ের বাংলার প্রকৃতি যেমন সুন্দর ছিল, তেমনি কঠোরও। কাঁচা রাস্তা বর্ষায় কাদায় থইথই করতো। গরুর গাড়ির চাকা প্রায়ই আটকে যেত, ফলে সৈন্য ও চালকদের একসঙ্গে ঠেলে গাড়ি বের করতে হতো।
পথে থাকতো উঁচুনিচু জমি, বাঁশঝাড়, খাল-বিল, নদীর ভাঙন, যা যাত্রাকে আরও দুরূহ করতো।
প্রতিটি কাফেলায় থাকতো ছয় থেকে আট জোড়া গরু, এক জন ব্রিটিশ অফিসার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত দেশি তদারককারী, এবং ১০–১৫ জন সশস্ত্র সৈন্য।
সৈন্যদের হাতে থাকতো রাইফেল ও তলোয়ার, আর চালকদের দায়িত্ব ছিল গরুর যত্ন ও গাড়ির নিয়ন্ত্রণ। প্রত্যেকের কাজ ছিল সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত।
যশোর অঞ্চলের রাজস্ব লক্ষাধিক টাকা ছাড়াতো। একটি ট্রেজারি কাফেলা ছিল ভ্রাম্যমাণ ব্যাংকের মতো, যেখানে পরিবহিত অর্থ প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এই যাত্রার প্রতিটি ধাপের রেকর্ড সংরক্ষণ করা হতো, যাতে কোনো অর্থ হারিয়ে গেলে তা অনুসন্ধান করা যায়।
টমাস ম্যাচেল লিখেছিলেন—এই অর্থযাত্রা কেবল অর্থ প্রেরণ নয়, বরং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, সাহসিকতা ও দূরদর্শিতার এক অনন্য উদাহরণ।
প্রহরীদের মধ্যে সতর্কতা, চালকদের ধৈর্য, ও সমন্বিত প্রচেষ্টা এই যাত্রাকে সফল করতো। একেকটি কাফেলা দৃঢ় দায়িত্ববোধ ও দেশজ অভিজ্ঞতার মিশেলে পরিচালিত হতো।
আজকের দিনে ব্যাংক ট্রান্সফার, অনলাইন লেনদেন ও ডিজিটাল নিরাপত্তার যুগে গরুর গাড়িতে রাজস্ব পরিবহন শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু ঐতিহাসিক দলিল ও দিনলিপি প্রমাণ করে—এটি ছিল বাস্তব, কঠিন ও সাহসিকতায় ভরা এক অধ্যায়।
এখন এই কাহিনী কেবল ইতিহাসের অংশ হলেও, এটি প্রশাসনিক অধ্যবসায় ও দায়িত্ববোধের প্রতীক হয়ে আছে।অর্থনৈতিক সংযোগ: যশোর ও কলকাতার মধ্যে অর্থপ্রবাহ বজায় রাখা।প্রশাসনিক কৌশল: সশস্ত্র পাহারা, রিলে সিস্টেম ও রাতের নিরাপত্তা।প্রকৃতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা: কাদা, উঁচুনিচু জমি, নদী ভাঙন পেরোনো।সামরিক শৃঙ্খলা: সৈন্যদের সতর্কতা ও নেতৃত্ব।ঐতিহাসিক প্রমাণ: টমাস ম্যাচেলের দিনলিপি ও সরকারি নথি।
ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় গরুর গাড়িতে রাজস্ব পরিবহন ছিল এক সাহসিকতাপূর্ণ প্রশাসনিক উদ্যোগ। বিপদসংকুল পথ, প্রকৃতির বাধা ও ডাকাতের হুমকি উপেক্ষা করে এই কাফেলাগুলো নিরাপদে অর্থ কলকাতায় পৌঁছে দিত। আজ এটি কেবল ঐতিহাসিক গৌরবের কাহিনী, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—দায়িত্ব ও শৃঙ্খলা থাকলে অসম্ভবও সম্ভব।
✍️ তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১৩ আগস্ট ২০২৫


