সাম্প্রতিক এক গবেষণা দাবি করছে, মানুষের মদ হজম করার ক্ষমতা কেবল সভ্যতার ফসল নয়, বরং এর শেকড় প্রোথিত আছে প্রাগৈতিহাসিক অতীতে। শিম্পাঞ্জি ও গরিলার মতো প্রাচীন আত্মীয়দের কাছ থেকেই মানুষ পেয়েছে অ্যালকোহল হজম করার ক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রের ডর্টমাউথ কলেজ এবং স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এই যুগান্তকারী অনুসন্ধান প্রকাশিত হয়েছে বায়োসায়েন্স জার্নালে।
গবেষকরা শিম্পাঞ্জিদের গাছের নিচে পড়ে থাকা গেঁজে যাওয়া ফল কুড়িয়ে খাওয়ার অভ্যাস বোঝাতে ব্যবহার করেছেন ‘স্ক্রাম্পিং’ শব্দটি। শব্দটির উৎস জার্মান ‘স্ক্রিমপেন’, যার অর্থ অতিপাকা বা পচা ফল। বর্তমানে ব্রিটেনে ‘স্ক্রাম্পি’ বলতে এক ধরনের আপেলের সুরা বোঝায়, যাতে ৬-৯% অ্যালকোহল থাকে।
শিম্পাঞ্জি ও গরিলারা এই ধরনের পচা বা গেঁজে যাওয়া ফল খেয়ে স্বাভাবিকভাবেই অ্যালকোহল গ্রহণ করত। এই প্রাকৃতিক অভ্যাসই মানুষের জিনে প্রভাব ফেলেছে, যার ফলে আধুনিক মানুষ প্রাচীন পূর্বপুরুষদের তুলনায় প্রায় ৪০ গুণ বেশি অ্যালকোহল হজম করতে সক্ষম।
মানুষ, শিম্পাঞ্জি, গরিলা, বোনোবো এবং ওরাংওটাং – সবাই মিলে গঠন করেছে ‘গ্রেট এপ’ পরিবার। মানুষের সবচেয়ে কাছের জেনেটিক আত্মীয় শিম্পাঞ্জি ও গরিলারা প্রতিদিন গড়ে পাঁচ কেজি পর্যন্ত ফল খেত। ফলগুলির অনেকটাই গাছ থেকে না পেড়ে, বরং মাটি থেকে কুড়িয়ে খাওয়া হত, যেগুলো আংশিক গেঁজে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে অ্যালকোহল ধারণ করত।
২০১৫ সালের একটি জিনগত গবেষণায় প্রমাণ মিলেছিল, আফ্রিকান এপদের শরীরে অ্যালকোহল হজমের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম আগে থেকেই ছিল। গবেষকদের মতে, বড় আকারের কারণে এরা বাঁদরের মতো চটপট গাছে উঠতে পারত না, তাই মাটিতে পড়া ফল খাওয়াই ছিল স্বাভাবিক অভ্যাস।
ডর্টমাউথ কলেজের অধ্যাপক ন্যাথানিয়েল ডমিনি বলেন,“আমরা মদ তৈরি শেখার বহু আগেই অ্যালকোহল হজম করার ক্ষমতা অর্জন করেছি।”
সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্স অধ্যাপক ক্যাথরিন হোবায়টার যুক্ত করেছেন এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি মনে করেন, যদি শিম্পাঞ্জি ও গরিলাদের মধ্যে একসাথে বসে ফল খাওয়ার অভ্যাস থেকে থাকে, তবে মানুষের সামাজিকভাবে একসঙ্গে বসে মদ্যপানের প্রবণতার শিকড়ও সেখানেই লুকিয়ে থাকতে পারে।
প্রাগৈতিহাসিক কালে পচা ফল থেকে প্রাপ্ত স্বল্পমাত্রার অ্যালকোহল গ্রহণ হয়তো প্রথমে ছিল নিছক খাদ্যাভ্যাসের অংশ। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এটি হয়ে ওঠে সামাজিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু। আজ আমরা বন্ধুদের সাথে কিংবা উৎসবে মদ্যপান করি, যা হয়তো গভীরভাবে প্রোথিত আমাদের বিবর্তনীয় ইতিহাসে।
এই গবেষণা প্রমাণ করে, মানুষের অ্যালকোহল হজমের ক্ষমতা কেবল সভ্যতার উপহার নয়, বরং এটি এসেছে আমাদের প্রাচীন আত্মীয়দের কাছ থেকে। শিম্পাঞ্জি ও গরিলাদের পচা ফল খাওয়ার অভ্যাসই হয়তো মানুষের সামাজিক মদ্যসংস্কৃতির সূচনা ঘটিয়েছে। ফলে বলা যায়, মদের প্রতি মানুষের আগ্রহ আসলে মিলিয়ন বছরের বিবর্তনের ফলাফল।


