বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্থান নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে বিতর্ক ও আলোচনা চলছে, তা কেবল রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ নয়—এটি ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের আলাপ-আলোচনা থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গন ও সামাজিক মাধ্যম পর্যন্ত। দীর্ঘ সাড়ে পনেরো বছরের আওয়ামী লীগ শাসনের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধাক্কায় একেবারে বিপরীতমুখী ধারা দেখা দিয়েছে, যেখানে শেখ মুজিবকে ঘিরে গড়ে ওঠা একমুখী বয়ান এখন চ্যালেঞ্জের মুখে।এ খবর বিবিসি বাংলা অনলাইনের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি প্রজন্মের কাছে শেখ মুজিবের ভাবমূর্তি বর্তমানে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙা হয়, এমনকি ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। নাগরিক আন্দোলনের নেতা অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতে, এসব ঘটনার পেছনে দুটি ধারা কাজ করেছে—একটি স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ, অন্যটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তৎপরতা।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার দীর্ঘ একনায়কতান্ত্রিক শাসনে মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ জমে উঠেছিল, তার বহিঃপ্রকাশেই প্রথম দফায় এ ধরনের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে বিভিন্ন গোষ্ঠী রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে ভাঙচুর অব্যাহত রাখে, যা আর স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না।
অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, পরিস্থিতির জন্য আওয়ামী লীগেরই দায় বেশি। শেখ মুজিবকে ঘিরে দলীয় পর্যায়ে অতিরিক্ত প্রশংসা ও একমুখী ইতিহাস তৈরির প্রবণতা মানুষের মধ্যে বিরক্তি সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, শেখ মুজিবের দুটি পরিচিতি রয়েছে—একজন স্বাধীনতার স্থপতি এবং ১৯৭২-৭৫ সময়কালের রাষ্ট্রনায়ক, যখন বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দ্বৈত পরিচয়ের কারণে বিতর্ক সবসময়ই ছিল, তবে এখন তার ইতিহাসে অবস্থানই প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামীম রেজা বলেন, পূর্ববর্তী সরকার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে একমুখী রাজনৈতিক চরিত্র নির্মাণের চেষ্টা করেছিল, যেখানে অন্য ঐতিহাসিক চরিত্রদের অবদান অবহেলিত হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
শেখ মুজিবের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন থেকে শুরু করে মুজিব কর্ণার প্রতিষ্ঠা, বিপুল অর্থ ব্যয়ে প্রকাশিত নিম্নমানের বই—এসব কর্মকাণ্ড মানুষের কাছে অতিরিক্ত ও কৃত্রিম মনে হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া, ইতিহাসচর্চা নয়। ফলে এসব বাড়াবাড়ি বরং নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সাবেক সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের মতে, আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছে, ফলে তিনি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেননি। ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি তাৎক্ষণিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা দল ও নেতার জন্য ক্ষতিকর।
পরিস্থিতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে নতুন প্রজন্মের ওপর। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি ঘিরে একসময় যে অনুষ্ঠানমালা থাকত, এখন সেখানে আওয়ামী লীগপন্থীরা প্রবেশই করতে পারে না। পাঠ্যবইতেও বড় পরিবর্তন এসেছে—যেখানে আগে শেখ মুজিবকে অপরিসীম প্রশংসার সঙ্গে উপস্থাপন করা হতো, এখন তার বিপরীত বয়ান যুক্ত হয়েছে।
ফলে শিক্ষার্থীরা দ্বিধা ও বিভ্রান্তিতে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের সময় শেখ মুজিবের ভাবমূর্তি গড়ে তোলার যে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল, তা ছিল জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া; আর সেই কারণেই জুলাই-অগাস্ট আন্দোলনে তরুণরাই নেতৃত্ব দিয়েছে।
বর্তমানে শেখ মুজিবকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি ভেঙে ফেলা ও সেখানে কর্মসূচি পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনা কিছু মানুষের কাছে সহানুভূতি জাগালেও, বৃহত্তর পরিসরে বিতর্ক ও মতবিরোধ আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান নিঃসন্দেহে এক অবিচ্ছেদ্য চরিত্র। তবে দলীয় সীমাবদ্ধতা, অতিরিক্ত প্রশংসা, বিকল্প বয়ানের অনুপস্থিতি এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা—সব মিলিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে তার ভাবমূর্তি আজ প্রশ্নের মুখে। ইতিহাসকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হলে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বহুমাত্রিক বয়ান উপস্থাপনই হতে পারে সমাধান।


