যশোর জেলার মনিরামপুর উপজেলার হরিদাসকাঠি ইউনিয়নের কাটাখালি গ্রামে অবস্থিত শাহ মান্দারতলা এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মিলনস্থল। মনিরামপুর উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৯ কিলোমিটার পূর্বে এবং যশোর জেলা শহর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দক্ষিণে এই স্থানটি অবস্থিত। নতুন পিচঢালা রাস্তার সুবাদে ভ্রমণ এখন অনেক বেশি আরামদায়ক হয়ে উঠেছে।
ভ্রমণপথে চোখে পড়ে সবুজে ভরা ধানক্ষেত, শস্যভরা সবজির জমি, গম ও ডালের ক্ষেত এবং সরিষার হলুদ ফুলে আচ্ছাদিত প্রান্তর। হালকা বাতাসে দুলতে থাকা ধানের শিষ, দূরের পাখির ডাক এবং প্রকৃতির স্নিগ্ধ দৃশ্য ভ্রমণকারীদের মনকে করে তোলে প্রফুল্ল। পথের প্রতিটি মুহূর্ত যেন আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রথম ধাপ হয়ে ওঠে।
শাহ মান্দারতলার নামকরণের পেছনে শাহ মান্দার নামে এক লৌকিক পীরের কাহিনি প্রচলিত আছে। যদিও তাঁর সম্পর্কে লিখিত ইতিহাস খুব বেশি পাওয়া যায় না, তবে স্থানীয় লোককথায় তিনি পরিচিত হয়েছেন এমন এক মহাপুরুষ হিসেবে যিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান—সব ধর্মের অনুসারীরা তাঁকে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও মিলনের প্রতীক হিসেবে মান্য করেন।
এই আধ্যাত্মিক সাধকের স্মৃতিধন্য স্থান আজও সকল ধর্মাবলম্বীর কাছে পবিত্র হিসেবে বিবেচিত। মানুষ তাদের মনের আশা পূরণের জন্য এখানে মানত করে, প্রার্থনা করে এবং শান্তির আশ্রয় খোঁজে।
শাহ মান্দারতলার চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো বৃক্ষগুলো এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এসব বৃক্ষের ছায়াতলে বসে মনে হয় সময় যেন থেমে গেছে। আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি এখানে প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ও রবিবার বসে লোকজ মেলা।
এই মেলাকে কেন্দ্র করে চারপাশ জমে ওঠে রঙিন আবহে। আতর, ফুলের মালা, চুড়ি, মিষ্টি, খেলনা এবং গ্রামীণ পণ্যের দোকান বসে। স্থানীয় মানুষের আড্ডা, গল্পগুজব ও লোকসংগীতের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে পরিবেশ। এতে শাহ মান্দারতলা হয়ে ওঠে শুধু ধর্মীয় তীর্থস্থানই নয়, বরং একটি প্রাণবন্ত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
এই স্থান কেবল ভক্তদের মানসিক শান্তির জায়গা নয়, বরং এটি ঐক্য, সহমর্মিতা এবং ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। এখানে গেলে মনে হয় ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাস ও সংস্কৃতির মানুষ এক ছাতার নিচে এসে মিশে গেছে।
প্রকৃতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন শাহ মান্দারতলাকে দিয়েছে এক অনন্য পরিচিতি। যেকোনো দর্শনার্থী এখানে এসে শান্তির আবেশে ভিজে যান, মনোবাসনা পূরণের আশায় প্রার্থনা করেন এবং আধ্যাত্মিক শক্তি অনুভব করেন।
শাহ মান্দারতলা এখন শুধু ধর্মীয় তীর্থস্থান নয়, বরং যশোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত হচ্ছে। নতুন সড়ক ও উন্নত অবকাঠামো ভ্রমণকারীদের যাতায়াত সহজ করে তুলেছে। সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি উদ্যোগ থাকলে এই স্থান আরও বেশি পর্যটক আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করবে।
শাহ মান্দারতলা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি শান্তি, মিলন ও মানবিকতার প্রতীক। এখানে এসে মনে হয় প্রকৃতি, বিশ্বাস ও সংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। যশোর ভ্রমণে যারা প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি আধ্যাত্মিকতার স্পর্শ পেতে চান, তাদের জন্য শাহ মান্দারতলা হতে পারে সবচেয়ে উপযুক্ত গন্তব্য।
✍️তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১৬ আগস্ট ২০২৫


