বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর মাটির ভেতরে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। যশোর জেলার নরেন্দ্রপুর গ্রাম সেই অমূল্য সম্পদের অন্যতম ধারক। এখানে রয়েছে কার্তিক মন্দির বা স্থানীয়দের ভাষায় শিব মন্দির, যা শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর পিতৃকূল ও নারীমুক্তির ইতিহাসের সাথে জড়িত এক অমূল্য ঐতিহ্য।
এই প্রাচীন মন্দিরে পদার্পণ করলে মনে হয় সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। মন্দিরের দেয়ালে খোদাই করা ইতিহাস, ভাঙাচোরা অলংকরণ, আর চারপাশের নিস্তব্ধতা আমাদের নিয়ে যায় ১৮শ ও ১৯শ শতকের গৌরবময় বাংলায়।
নরেন্দ্রপুর গ্রামকে শুধু একটি সাধারণ গ্রাম ভাবা ভুল হবে। এখানেই জন্ম নিয়েছিলেন সেই মহীয়সী নারী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী (১৮৫০-১৯৪১), যিনি বাঙালি নারীর ইতিহাসে বিপ্লব ঘটান।তিনি ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্নী, যিনি ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের প্রথম ভারতীয় সদস্য।বাল্যবিবাহে আবদ্ধ হলেও, তিনি ঠাকুরবাড়ির প্রথম নারী, যিনি স্বামীর সঙ্গে মুম্বাইতে বসবাস শুরু করেন।সেখানেই তিনি ইউরোপীয় ও পারসিক সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘ব্রাহ্মিকা শাড়ি’ প্রচলন করেন। এতে ব্লাউজ, পেটিকোট, জুতা ও মোজা অন্তর্ভুক্ত ছিল—যা নারীদের জনসমক্ষে স্বাচ্ছন্দ্যে বের হওয়ার পথ তৈরি করে দেয়।
তার কলমও ছিল প্রখর। “ইংরেজ নিন্দা ও স্বদেশ অনুরাগ” প্রবন্ধ, শিশুদের জন্য ‘সাত ভাই চম্পা’ ও ‘টাক ডুমাডুম’ নাটক রচনা, এমনকি রবীন্দ্রনাথের নাটকে অভিনয়—সবকিছুতেই তার সাহসী উপস্থিতি ছিল অনন্য।
আজও তিনি স্মরণীয় নারীর স্বাধীনতা, শিক্ষাবিস্তারের প্রতীক হিসেবে।
নরেন্দ্রপুর গ্রামের কার্তিক মন্দির (শিব মন্দির) নির্মিত হয়েছিল বাংলা ১২৬১ বঙ্গাব্দে (১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দ) তৎকালীন জমিদার নারায়ণ মজুমদারের উদ্যোগে।
মন্দিরের দেয়ালে খোদাই করা শিলালিপিতে দুটি সাল পাওয়া যায়—১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২৬১ বঙ্গাব্দ এগুলো মন্দিরের প্রাচীনত্ব ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।
একসময় মন্দিরের পাশে একটি তিনতলা জমিদার বাড়ি ছিল, যা বর্তমানে নেই। তবে স্থানীয়রা আজও সেই গৌরবগাথা স্মরণ করেন।
মন্দিরের স্থাপত্যকলা বাংলার ঐতিহ্যবাহী ধারা এবং ইন্দো-মুসলিম প্রভাবের সমন্বয়ে গঠিত।বর্গাকার ভিত্তি এবং চুন-সুরকির গাঁথুনি।দেয়ালে রয়েছে চুনবালির প্রলেপ।শ্বেতপাথরে উৎকীর্ণ প্রটো বাংলা হরফের শিলালিপি।প্রধান প্রবেশদ্বারের ওপরে রয়েছে অর্ধগোলাকার খিলান দরজা।দরজার পাটাতনে ময়ূরের পেখমের অলংকরণ।চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে ফুল-লতাপাতার নকশা ও স্ট্যাকো ফ্লোরাল ডিজাইন।
মন্দিরটি দক্ষিণমুখী এবং প্রায় চার শতাংশ জমির ওপর নির্মিত।রয়েছে পাঁচটি মোচাকৃতি চূড়া।ছাদে রয়েছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী আটচালা নকশা।
উত্তর ও পশ্চিম দিকের দরজাগুলো আসলে ‘ব্লাইন্ড আর্চ’—যা দেখতে দরজার মতো হলেও বাস্তবে বন্ধ।
প্রতিটি দরজার দুপাশে পিলাস্টার কলাম মন্দিরকে দিয়েছে আরও রাজসিক সৌন্দর্য।
আজ মন্দিরটির অবস্থা করুণ।বহু জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়েছে।ইট ক্ষয়ে গেছে, অলংকরণ ভেঙে পড়েছে।ছাদে জন্ম নিয়েছে পরজীবী উদ্ভিদ, যা স্থাপত্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তবুও, শতাব্দীর ইতিহাস বুকে নিয়ে মন্দিরটি দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।
নরেন্দ্রপুর গ্রাম ও কার্তিক মন্দির শুধুমাত্র ধর্মীয় স্থান নয়। এটি হলো—ঐতিহাসিক নারীমুক্তির প্রতীক, স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন, গ্রামীণ বাংলার সংস্কৃতির ধারক।
যশোর ভ্রমণে এ স্থানকে বাদ দিলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পর্যটকদের জন্য এটি একদিকে যেমন ধর্মীয় তীর্থস্থান, অন্যদিকে ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য ঐতিহ্যের গুপ্তধন।
এই অমূল্য ঐতিহ্যকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন—সরকারি উদ্যোগে সংস্কার ও সংরক্ষণ প্রকল্প।ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি।স্থানীয়দের অংশগ্রহণে পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষা।
যদি যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তবে কার্তিক মন্দির শুধু নরেন্দ্রপুর নয়, পুরো বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের একটি উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
নরেন্দ্রপুর গ্রামে অবস্থিত কার্তিক মন্দির (শিব মন্দির) শুধু একটি প্রাচীন স্থাপনা নয়—এটি জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর পদচিহ্ন, নারীমুক্তির ইতিহাস এবং বাংলার স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অমূল্য দলিল।
যশোর ভ্রমণকারীদের জন্য এটি অবশ্যই দর্শনীয় স্থান। এখানে এলে অনুভব করা যায়, আমরা শুধু একটি মন্দির দর্শন করছি না—বরং বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও গৌরবের স্পর্শ পাচ্ছি।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১৬ আগস্ট ২০২৫


