যশোর জেলার শার্শা উপজেলার পাকশিয়া বাজারে একটি চায়ের দোকান আছে, যা শুধু একটি দোকান নয়—এটি এক ঐতিহ্যের নাম, স্মৃতির ভাণ্ডার এবং ভালোবাসার আড্ডাখানা। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই দোকান আজও সমান জনপ্রিয়। সময় পাল্টেছে, বাজারের চেহারা বদলেছে, দোকানের অবস্থানও একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু চায়ের স্বাদ, মানুষের টান এবং আন্তরিকতার উষ্ণতা রয়ে গেছে অবিকল। বর্তমানে এই দোকান পরিচালনা করছেন আব্দুল হান্নান, যিনি প্রায় চার দশক ধরে তার হাতে বানানো চা দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করে চলেছেন।
এই দোকানের গল্প শুরু হয়েছিল আব্দুল হান্নানের পিতা আকবর ব্যাপারির হাত ধরে। পাকশিয়া বাজারের প্রাণকেন্দ্রে তিনি প্রথম দোকানটি চালু করেছিলেন। তার সময়ে দোকানটি ছিল গ্রামীণ মিলনমেলা, যেখানে মানুষ শুধু চা পান করতেই নয়, বরং আড্ডা, গল্পগুজব আর পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন গড়তে আসতেন।
দোকানের সামনে ছিল এক বিশাল রক্ত জবা ফুলের গাছ। গ্রামের শিশু-কিশোরেরা প্রতিদিন সেখানে ভিড় করত। অনেকেই গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ে নিয়ে যেত, আর দোকানে বসে দুধ-চায়ের কাপে চুমুক দিত। সেই জায়গা হয়ে উঠেছিল গ্রামীণ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এই দোকান পরিচালনা করছেন আব্দুল হান্নান। তিনি জানেন চায়ের প্রতিটি স্তর কতটা যত্ন নিয়ে তৈরি করতে হয়।পানি গরমের সঠিক মাত্রা তিনি নির্ভুলভাবে বোঝেন।চায়ের পাতি কতক্ষণ জ্বালালে সর্বোচ্চ স্বাদ আসবে, সেটিও তার হাতের মাপেই নির্ধারিত।দুধ, চিনি ও আদার সঠিক সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি তৈরি করেন এক অনন্য স্বাদের চা, যা গ্রামের মানুষের মনে আনন্দের ঢেউ তোলে।
আমরা যারা গ্রামের বাইরে থাকি, গ্রামে ফিরলেই প্রথম গন্তব্য হয় হান্নানের চায়ের দোকান। তার দোকানের ধোঁয়া ওঠা কাপে চুমুক না দিলে গ্রামের সফর অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
পাকশিয়ার এই দোকান কেবল চা বিক্রির জায়গা নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে গ্রামীণ জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত এখানে ভিড় লেগেই থাকে। কৃষক, ছাত্র, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী—সবাই একসাথে বসে আড্ডা জমায়।কেউ আলোচনা করে রাজনীতি, কেউ মেতে ওঠে গ্রামের খেলার গল্পে, আবার কেউ শেয়ার করে জীবনের সুখ-দুঃখের স্মৃতি।
এই দোকান যেন এক খোলা বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে প্রতিটি আলাপচারিতায় মেলে জ্ঞানের খোরাক ও মানবিক সম্পর্কের গভীরতা।
পাকশিয়া হাই স্কুল থেকে পাশ করা অসংখ্য মানুষ আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু যখনই তারা গ্রামে ফেরে, প্রথমেই আব্দুল হান্নানের দোকানে গিয়ে বসে চায়ের কাপে চুমুক দেয়। প্রতিটি চায়ের কাপে তারা খুঁজে পায় শৈশবের গন্ধ, পুরনো দিনের বন্ধুদের সান্নিধ্য এবং গ্রামের অমলিন স্মৃতি।
গত সপ্তাহে এক গ্রাম সফরে আমরা নিজেরাও এই দোকানে বসেছিলাম। সেখানে দেখা হয়েছিল বহু পুরনো বন্ধুর সঙ্গে। সবার হাতে এক কাপ গরম চা, আর মুখে হাসি—সে মুহূর্ত আমাদের মনে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।
আব্দুল হান্নান কেবল একজন চায়ের দোকানদার নন। তিনি যেন গ্রামের অভিভাবক।তার হাসি দিয়ে তিনি সবাইকে আপন করে নেন।ছোটদের তিনি স্নেহ করেন, বড়দের সম্মান দেন।নতুন অতিথিদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান।
শৈশবে আমরা তার বাবার হাতে যে দুধ-চা খেতাম, সেই স্বাদ এখনও ভুলতে পারিনি। আজ তার ছেলের হাতে তৈরি চা সেই ঐতিহ্যকে বহন করে চলছে।
আব্দুল হান্নানের দোকান মানে শুধু চা নয়—এটি একটি গ্রামীণ মাধুর্য ও সংস্কৃতির প্রতীক।এখানে বসে চা খাওয়া মানে শুধু তৃষ্ণা মেটানো নয়, বরং মানবিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করা।এই দোকান গ্রামের মানুষের আনন্দ, ভালোবাসা ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে।প্রতিটি চুমুক আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গ্রামের সৌন্দর্য শুধু প্রকৃতিতে নয়, মানুষের হৃদয়ের ভালোবাসাতেও লুকিয়ে আছে।
এই দোকান কেবল ব্যবসা নয়, বরং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে স্মৃতি ও ঐতিহ্যের হস্তান্তর। আকবর ব্যাপারির হাত ধরে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ তার ছেলে আব্দুল হান্নানের হাতে নতুন রূপে জীবন্ত। ভবিষ্যতে হয়তো তার সন্তানরাও এই ঐতিহ্য ধরে রাখবে, আর পাকশিয়ার মানুষের ভালোবাসায় তা হবে আরও অটুট।
পাকশিয়ার এই চায়ের দোকান শুধু একটি সাধারণ দোকান নয়, এটি হলো ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু, স্মৃতির আড্ডাঘর এবং আন্তরিকতার প্রতীক। আব্দুল হান্নানের হাতে তৈরি প্রতিটি চা যেন মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশবের সরলতায় ও গ্রামীণ জীবনের স্বাদে।
আজকের এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও এই দোকান মানুষকে শিখিয়ে দেয়—সম্পর্কের উষ্ণতা, আন্তরিকতা আর ভালোবাসাই জীবনের আসল সম্পদ।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১৮ আগস্ট ২০২৫


