বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে অসংখ্য কৃতী সাঁতারুর নাম শোভা পাচ্ছে। কিন্তু তাঁদের মধ্যে মোঃ জলিলুর রহমান এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যিনি ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে জাতীয় পর্যায়ের সাঁতার প্রতিযোগিতায় সাফল্যের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর ক্রীড়া জীবন শুধু ব্যক্তিগত অর্জনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পারিবারিকভাবে তাঁরা ছিলেন ক্রীড়াবিদ তৈরির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
মোঃ জলিলুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৫ সালের ১লা ডিসেম্বর যশোর শহরের ষ্টেডিয়ামপাড়ায়। তাঁর পিতা ছিলেন তাজেম আলী, যার মূল বাড়ি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার কালিহাতায়। শৈশব থেকেই পরিবারে ক্রীড়া পরিবেশ বিরাজ করায় জলিলুর রহমান খেলাধুলার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করেন।
তাঁর দ্বিতীয় ভাই মিজানুর রহমান জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃতী সাঁতারু ছিলেন। এমনকি তাঁর চাচাতো ভাইও কুস্তিতে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন। বলা যায়, এই পরিবারের অধিকাংশ পুরুষ সদস্যই ছিলেন সাঁতার ও অন্যান্য খেলাধুলায় পারদর্শী। ফলে ক্রীড়ার প্রতি তাঁদের প্রবল টান ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবেই।
জলিলুর রহমানের শিক্ষাজীবনও সমানভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি মাগুরা সরকারি কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষা জীবনের পাশাপাশি তিনি সাঁতারে মনোযোগী ছিলেন। কলেজ পর্যায়ে আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় তিনি বিশেষ কৃতিত্বের সাক্ষর রাখেন, যা তাঁর ক্রীড়া জীবনের ভিত আরও দৃঢ় করে তোলে।
শৈশবকালেই তিনি সাঁতারের প্রতি আগ্রহী হন এবং প্রশিক্ষণ নেন যশোরের বিশিষ্ট সাঁতার প্রশিক্ষক মনির হোসেন খান-এর কাছে। মনির হোসেন খানের প্রশিক্ষণ তাঁকে গড়ে তোলে একজন দক্ষ সাঁতারু হিসেবে। নিয়মিত অনুশীলন ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি দ্রুত জাতীয় পর্যায়ে নিজেকে তুলে ধরতে সক্ষম হন।
জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় প্রথম বড় অর্জন আসে ১৯৭৬ সালে, যখন তিনি তৃতীয় স্থান অর্জন করে ব্রোঞ্জ পদক পান। এটি ছিল তাঁর প্রতিযোগিতামূলক জীবনের প্রথম সাফল্য, যা তাঁকে আত্মবিশ্বাস জোগায়।
এরপরের বছর, ১৯৭৭ সালে, তিনি “যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থা”-এর পক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। সেখানে তিনি ব্রেস্ট স্ট্রোকে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক জয় করেন। একই সাথে তাঁকে জুনিয়র সাঁতারুদের মধ্যে সেরা সাঁতারু নির্বাচিত করা হয়। এই অর্জন তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়।
প্রথম বয়সভিত্তিক জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালে। সেখানে তিনি বাটার ফ্লাই ইভেন্টে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন এবং ব্রোঞ্জ পদক পান।
১৯৮০ সালে তিনি একইসাথে দুটি ইভেন্টে পদক জেতেন—২০০ মিটার বাটার ফ্লাইয়ে তৃতীয় স্থান, ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে তৃতীয় স্থান, দুটি ব্রোঞ্জ পদক তাঁর সংগ্রহে যোগ হয়।
পরবর্তী বছর ১৯৮১ সালে, জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় তিনি ব্রেস্ট স্ট্রোকে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন এবং রৌপ্য পদক লাভ করেন। এটি ছিল তাঁর ক্রীড়া জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অর্জন।
শিক্ষাজীবনের সময়ও তিনি ক্রীড়াক্ষেত্রে সমানতালে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালে আন্তঃকলেজ সাঁতার প্রতিযোগিতায় ব্যক্তিগত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তাঁর ধারাবাহিকতা এবং দক্ষতা তাঁকে কলেজ পর্যায়েও শীর্ষে রাখে।
শুধু সাঁতারেই নয়, তিনি খো খো খেলাতেও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এটি প্রমাণ করে যে তিনি বহুমুখী ক্রীড়াবিদ ছিলেন। খেলাধুলার প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা তাঁকে সর্বদাই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণে উৎসাহিত করেছিল।
মোঃ জলিলুর রহমান শুধু একজন সফল সাঁতারুই নন, তিনি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক অনুপ্রেরণার প্রতীক। তাঁর অর্জিত পদক ও স্বীকৃতিগুলো আজও নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের প্রেরণা যোগায়। পরিবার থেকেই পাওয়া ক্রীড়া ঐতিহ্য এবং নিজস্ব পরিশ্রম তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে অমর করে রেখেছে।
তাঁর সাফল্যের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় ও সঠিক প্রশিক্ষণ থাকলে একজন ক্রীড়াবিদ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম হতে পারেন।
মোঃ জলিলুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের সাঁতার ইতিহাসের এক অনন্য নক্ষত্র। তাঁর সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং পারিবারিক ও জাতীয় গৌরবের প্রতীক। ব্রোঞ্জ থেকে শুরু করে স্বর্ণপদক পর্যন্ত তাঁর সংগ্রহ প্রমাণ করে যে তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই একনিষ্ঠ ক্রীড়াবিদ। একই সাথে কলেজ পর্যায়ের চ্যাম্পিয়নশিপ এবং খো খো খেলায় প্রশিক্ষক হিসেবে তাঁর ভূমিকা তাঁকে বহুমাত্রিক ক্রীড়া ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে তাঁর নাম সর্বদাই শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ২০ আগস্ট ২০২৫


