আশির দশক ছিল এমন এক সময়, যখন গ্রামবাংলার গরমের দুপুরগুলোতে দূর থেকে ভেসে আসা মাইকের সুরই জানিয়ে দিত – আইসক্রীমওয়ালা আসছে। সাইকেলের ক্যারিয়ারে বড় স্টিলের বক্স আর তার ভিতরে ঠান্ডা ঠান্ডা আইসক্রীম, মিষ্টি সুরে বাজতে থাকা রেকর্ডের গান, আর চারপাশে শিশুদের উচ্ছ্বসিত ভিড়—এই দৃশ্য ছিল সেসময়ের গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সেই সময় গ্রামীণ বাজারগুলোতে আইসক্রীম বিক্রি ছিল এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। বিক্রেতারা সাধারণত শহর থেকে গ্রামে আসতেন সকাল বা দুপুরের দিকে। সাইকেলের পেছনে থাকত বরফে ভর্তি টিনের ড্রাম, যার ভিতরে কাগজে মোড়ানো লাল, সবুজ, কমলা রঙের বরফ আইসক্রীম। দামও ছিল সস্তা—৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা। এই দাম শিশুদের নাগালে থাকলেও, প্রতিদিন কেনার জন্য অনেক সময় বাবামায়ের কাছে অনুমতি নিতে হত।
আইসক্রীমওয়ালারা সাধারণত গ্রামীণ স্কুল, হাট বা জনবহুল মোড়ে থামতেন। তাদের সাইকেলের সাথে থাকত ছোট ব্যাটারি চালিত মাইক, যেখান থেকে বাজত জনপ্রিয় বাংলা বা হিন্দি গান। মাইকের সুর শোনা মাত্রই শিশুরা দৌড়ে যেত আইসক্রীমওয়ার কাছে। কারো হাতে থাকত মায়ের দেওয়া এক টাকার কয়েন, কেউবা বন্ধুদের সাথে মিলে ভাগাভাগি করে কিনত।
আশির দশকের শেষ দিকে, যশোরের শার্শা উপজেলার পাকশিয়া বাজারে ঘটেছিল এক মজার ঘটনা। এক স্থানীয় ব্যক্তি অভিযোগ করলেন,“প্রতিদিন ওই আইসক্রীমওয়ালা এখানে আসে, আমার বাচ্চারা প্রতিদিন আমার কাছে টাকা চায় আইসক্রীম খাওয়ার জন্য। আজ তাকে মজা দেখাবো।”
তিনি আইসক্রীমওয়ার কাছ থেকে একটি আইসক্রীম কিনে ধীরে ধীরে চুষে খেতে লাগলেন। প্রায় পাঁচ মিনিট পরে তিনি হঠাৎ মাটিতে পড়ে চিৎকার শুরু করলেন—“আমি মরে গেলাম! আমার পেট জ্বলছে! বন্ধুরা, তোরা আয়, আমাকে বাঁচা!”
এটি ছিল পুরোপুরি সাজানো নাটক। চারপাশের মানুষ হতভম্ব হয়ে গেল। শেষমেশ জানা গেল, ঘটনাটি ছিল শুধু আইসক্রীমওয়ালাকে ভয় দেখানোর জন্য। এরপর থেকে সেই বিক্রেতা আর কখনো পাকশিয়া বাজারে আসেননি।
গ্রামে টেলিভিশন, ফ্রিজ বা আধুনিক বিনোদন তখন খুব কম ছিল। তাই আইসক্রীমওয়ালার আগমন শিশুদের কাছে ছিল উৎসবের মতো। গরমের দুপুরে ঠান্ডা আইসক্রীমের স্বাদ ছিল আনন্দের চূড়ান্ত রূপ। অনেক সময় শিশুরা টাকা না থাকলেও বিক্রেতার কাছে দাঁড়িয়ে থাকত, শুধু রঙিন আইসক্রীম দেখার জন্য।
সেই সময়ের আইসক্রীমে ছিল মূলত বরফ, রঙ ও মিষ্টি সিরাপ। তিন রঙা বা এক রঙা আইসক্রীম কাঠির সাথে কাগজে মোড়ানো থাকত। সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল—লাল রঙের রাস্পবেরি স্বাদ, সবুজ রঙের পুদিনা বা লেবুর স্বাদ, কমলা রঙের মাল্টা স্বাদ, স্বাদে ছিল সরলতা, কিন্তু আনন্দে ছিল অসীমতা।
এই বিক্রেতারা সাধারণত দরিদ্র বা নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে আসতেন। শহরের কোনো আইসক্রীম কারখানা থেকে পাইকারি দামে কিনে গ্রামে বিক্রি করতেন। দিনে প্রায় ২০-৩০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে একাধিক গ্রাম ঘুরে বিক্রি করতেন তারা। গরমে বরফ গলে যাওয়া রোধ করতে বক্সে বরফের ব্লক ব্যবহার করতেন।
আজকের দিনে ফ্রিজ, সুপারশপ ও ব্র্যান্ডেড আইসক্রীমের যুগে সেই গ্রামীণ সাইকেল আইসক্রীমওয়ালা প্রায় বিলীন। তবে আশির দশকের সেই সাইকেলের ঘণ্টা, মাইকের গান, আর ঠান্ডা মিষ্টি আইসক্রীমের স্বাদ এখনও অনেকের মনে অমলিন হয়ে আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই সময়কার ছবি বা গল্প দেখলেই যেন শৈশবের স্মৃতির দরজা খুলে যায়।
গ্রামীণ জীবনের এই আইসক্রীম বিক্রি কেবল ব্যবসা নয়, ছিল এক সাংস্কৃতিক দৃশ্য। এটি ছিল গ্রীষ্মের দিনে গ্রামের মানুষের বিনোদন, শিশুদের আনন্দ আর বিক্রেতাদের জীবিকার পথ। এই ঐতিহ্য আমাদের গ্রামের মানুষের মিলনমেলা ও সহজ-সরল জীবনের প্রতীক।
আশির দশকের সাইকেল আইসক্রীমওয়ালা শুধু একটি পেশার মানুষ ছিলেন না, তারা ছিলেন শৈশবের আনন্দবাহক। আজকের দিনে সেই দৃশ্য বিরল হলেও, স্মৃতির পাতায় তারা চিরদিন বেঁচে থাকবেন।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ২২ আগস্ট ২০২৫


