যশোরের দৈনিক রানার সম্পাদক আর এম সাইফুল আলম মুকুল হত্যা মামলা দেড় দশক ধরে হাইকোর্টে ঝুলে আছে। ১৯৯৮ সালের ৩০ আগস্ট ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ২৭ বছর পার হলেও বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। উচ্চ আদালতে রিটের কারণে মামলার কার্যক্রম নিম্ন আদালতে শুরু করতে না পারায় ঘাতকরা আজও আইনের ফাঁক গলে অব্যাহতি পাচ্ছে।
আজ ৩০ আগস্ট, শহীদ সাংবাদিক সাইফুল আলম মুকুলের ২৭তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে যশোরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। তবে পরিবার, সহকর্মী সাংবাদিক এবং যশোরবাসী বিচারহীনতার দীর্ঘশ্বাস নিয়ে দিনটি পালন করছেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালের ৩০ আগস্ট রাতে দৈনিক রানার সম্পাদক মুকুল শহর থেকে বেজপাড়ার নিজ বাসায় ফিরছিলেন। পথে চারখাম্বা মোড়ে দুর্বৃত্তরা তার ওপর বোমা হামলা চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় মুকুল ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
পরদিন, নিহতের স্ত্রী হাফিজা আক্তার শিরিন যশোর কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাত পরিচয় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে শুরু থেকেই মামলাটি নানা রাজনৈতিক প্রভাব ও আইনি জটিলতায় জড়িয়ে যায়।
১৯৯৯ সালের ২৩ এপ্রিল, সিআইডির যশোর জোনের তৎকালীন এএসপি দুলাল উদ্দিন আকন্দ তদন্ত শেষে সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন।
তবে আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক চাপের কারণে মামলাটি স্থগিত হয়ে যায়। এ সময় হাইকোর্ট থেকে মামলাটি বাতিল হয়ে যায়, ফলে বিচার প্রক্রিয়া কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে।
২০০৫ সালে হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ থেকে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হয় এবং বর্ধিত তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
২০০৫ সালের ২১ ডিসেম্বর, সিআইডির কর্মকর্তা মওলা বক্স নতুন করে আরও দু’জনের নাম যুক্ত করে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেন।
পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ১৫ জুন, যশোরের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল (৩) ও অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত (২) ২২ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন।এ সময় সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম ও রূপম নামে এক আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
২০১০ সালের মধ্যে যশোরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ২য় আদালতে ২৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। মনে করা হয়েছিল, এরপর মামলার আর্গুমেন্ট শুরু হবে এবং শিগগিরই রায় ঘোষিত হবে।
কিন্তু আসামি সাংবাদিক ফারাজী আজমল হোসেন হাইকোর্টে অব্যাহতির আবেদন করলে মামলার বিচার আবারও স্থবির হয়ে যায়। সেই থেকে দেড় দশক ধরে মামলাটি হাইকোর্টে ঝুলে আছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাড. সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, “মুকুল হত্যা মামলার বিচারকাজ শেষ পর্যায়ে ছিল। কিন্তু হাইকোর্টে এক আসামির আবেদনের কারণে মামলাটির আর্গুমেন্ট শুরু করা যায়নি। রিট নিষ্পত্তি হলে মামলার কার্যক্রম আবার শুরু হবে।”
যশোর প্রেসক্লাবের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন বলেন, “সাহসী সাংবাদিক সাইফুল আলম মুকুল হত্যার বিচার না হওয়া গভীর বেদনার। এতে হত্যাকারীরা উৎসাহী হয়ে ওঠে, আর সাংবাদিকদের মনোবল ভেঙে যায়। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই, মুকুল হত্যার বিচার দ্রুত শুরু হোক।”
সাংবাদিক মুকুলের স্মৃতিকে স্মরণ করতে যশোরে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।শোকর্যালি, শহীদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও দোয়া মাহফিল।
যশোর প্রেসক্লাব, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোর যৌথভাবে এ আয়োজন করছে।
২৭ বছর পার হলেও সাইফুল আলম মুকুল হত্যার বিচার শুরু হয়নি। দীর্ঘ আইনি জটিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও রিট মামলার কারণে বিচার প্রক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে আছে। সাংবাদিক সমাজ ও মুকুলের পরিবার সরকারের কাছে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছে।


