যশোরের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও দৈনিক রানার পত্রিকার সম্পাদক আরএম সাইফুল আলম মুকুলের ২৭তম হত্যাবার্ষিকী শোক ও শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে। সাংবাদিক সমাজ, সামাজিক সংগঠন এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো একত্রিত হয়ে হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার কার্যকর করার দাবি জানায়।
শনিবার সকালে প্রেস ক্লাব যশোর প্রাঙ্গণে কালো পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে দিবসটির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সাংবাদিকরা কালো ব্যাজ ধারণ করে শোক র্যালিতে অংশ নেন। র্যালিটি প্রেস ক্লাব থেকে শুরু হয়ে শহরের বেজপাড়া পিয়ারী মোহন রোডের মুকুল স্মৃতিস্তম্ভে গিয়ে শেষ হয়।
সেখানে প্রেস ক্লাব যশোর, সংবাদপত্র পরিষদ, সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোর, বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, দৈনিক গ্রামের কাগজ, লোকসমাজ, রাতদিন নিউজসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পুষ্পস্তবক অর্পণ করে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
মুকুল হত্যার বিচার দাবিতে প্রেস ক্লাব যশোরে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন। এসময় বক্তব্য দেন সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি একরাম-উদ-দ্দৌলা, সাধারণ সম্পাদক মবিনুর রহমান মবিন, প্রেস ক্লাব যশোরের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমানসহ সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।
সভায় বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “২৭ বছর পার হয়ে গেলেও সাংবাদিক আরএম সাইফুল আলম মুকুল হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাব ও জটিল আইনি প্রক্রিয়ার কারণে ন্যায়বিচার বিলম্বিত হচ্ছে, যা গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।”
এদিন একই স্থানে সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোরের উদ্যোগে আরও একটি আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের সভাপতি আকরামুজ্জামান সভাপতিত্ব করেন এবং অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন এস এম ফরহাদ হোসেন।
সভায় বক্তব্য রাখেন প্রেস ক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টোকন, যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি একরাম-উদ-দ্দৌলা, সাধারণ সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আহসান কবীর, সাবেক সহসভাপতি নুর ইসলাম, সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুল্লাহ হোসাইন, সাংবাদিক ইউনিয়নের সহসভাপতি বিএম আসাদ এবং ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন যশোরের সাধারণ সম্পাদক এম. আর. খান মিলন। নিহত সাংবাদিকের ভাই কবিরুল আলমও সেখানে বক্তব্য রাখেন।
বক্তারা একমত হন যে, আরএম সাইফুল আলম মুকুলকে কোনো ব্যক্তিগত বা অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে হত্যা করা হয়নি। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল সত্য প্রকাশের দায়ে।
তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দুঃখজনক যে, ২৭ বছরেও মুকুল হত্যার বিচার হয়নি। রাজনৈতিক রঙ লাগানোর কারণে যশোরের দুই খ্যাতিমান সাংবাদিক, সাইফুল আলম মুকুল ও শামছুর রহমান কেবলের হত্যাকাণ্ডের বিচার আজও সম্পন্ন হয়নি।” বক্তারা এ সময় মুকুল হত্যার দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার জন্য সরকার ও আদালতের কাছে জোর দাবি জানান।
১৯৯৮ সালের ৩০ আগস্ট রাতে, যশোর শহর থেকে রিকশায় বাড়ি ফেরার পথে চারখাম্বা মোড়ে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক আরএম সাইফুল আলম মুকুল।এই ঘটনায় তাঁর স্ত্রী হাফিজা আক্তার শিরিন অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
কিন্তু দীর্ঘ ২৭ বছর পরও মামলাটি এখনো উচ্চ আদালতে স্থগিত রয়েছে। এই দীর্ঘসূত্রতা সাংবাদিক সমাজসহ সারা দেশের মানুষকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে।
সাংবাদিক মুকুলের স্ত্রী হাফিজা আক্তার শিরিন বলেন, “ভেবেছিলাম জীবদ্দশায় বিচার দেখে যেতে পারব।কিন্তু এত বছর পরও কিছুই হলো না।
এখন বয়স বেড়েছে, শরীরেও নানা অসুস্থতা।আর ছুটে বেড়ানোর মতো শক্তি নেই, অর্থনৈতিক সচ্ছলতাও নেই।এখন সৃষ্টিকর্তার কাছেই বিচার প্রত্যাশা করি।”
সাংবাদিক সমাজ, মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক সংগঠনগুলো একযোগে দাবি জানিয়েছে, “সাংবাদিক সাইফুল আলম মুকুল হত্যার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।” তারা বলেছেন, একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিককে সত্য প্রকাশের দায়ে হত্যা করা গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারের ওপর ভয়াবহ আঘাত।


