ইস্তানবুল — এক শহর যেখানে ইতিহাসের গভীরতা, সংস্কৃতির বৈচিত্র্য এবং আধুনিক জীবনের স্পন্দন একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে। বসফরাসের তীরে দাঁড়িয়ে এই শহরের সৌন্দর্য যে কাউকেই মোহিত করে। আমি যে ক’দিন এখানে কাটিয়েছি, প্রতিটি মুহূর্ত যেন রঙিন স্মৃতির এক খনি।
ইস্তানবুলের স্পাইস বাজার থেকে এমিনোনু ফেরিঘাটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সামনে ভেসে উঠল বসফরাস ব্রিজের অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্য। সন্ধ্যা তখন নামছে, আকাশে লাল ও নীলচে রঙের অপূর্ব মেলবন্ধন। মনে হচ্ছিল শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক বর্ণিল ক্যানভাস। বসফরাসের পানিতে রক্তিম সূর্যের প্রতিফলন চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়।
শহর জুড়ে তখন আলোয় সেজে ওঠার সময়। বাতাসে ভেসে আসছে তুর্কি সঙ্গীত, রাস্তার ধারে জমে উঠেছে রাতের বাজার। ইস্তানবুলের রাত যেন এক নতুন গল্পের শুরু।
২০১১ সালের ৭ মে থেকে ১১ মে পর্যন্ত ইস্তানবুলে ছিলাম। সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়ে 4th UN Conference on LDCs-এ যোগ দেওয়া। এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল Lütfi Kırdar Convention & Exhibition Centre-এ।
সরকারি সফরের ব্যস্ততার মধ্যেও ইস্তানবুলের সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল। দূতাবাস আমাদের ঘোরার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, তবে আমরাও নিজেরা উদ্যোগী হয়ে শহরের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছি।
ইস্তানবুল এমন একটি শহর, যার প্রতিটি ইটপাথর ইতিহাসের গল্প বলে। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে উসমানীয় সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ—এই শহর ছিল সভ্যতার সংযোগস্থল। হায়া সোফিয়া, ব্লু মসজিদ, টপকাপি প্যালেসের মতো স্থাপনাগুলো একে বিশ্ব ইতিহাসের এক অমূল্য রত্নে পরিণত করেছে।
শহরের সরু গলি, পুরনো বাজার, মসজিদ ও রাজপ্রাসাদে হাঁটতে হাঁটতে বারবার মনে হয়, সময় যেন থমকে গেছে। তবুও ইস্তানবুল আধুনিক নগরজীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে ক্রমাগত নতুন করে গড়ে তুলছে।
ইস্তানবুলের স্পাইস বাজারে ঢুকলেই নাকে আসে ভেষজ, মসলা ও সুগন্ধির এক অনন্য মিশ্রণ। রঙিন মসলা, শুকনো ফল, তুর্কি ডিলাইট, কফি ও সুভেনিরে ভরা দোকানগুলো পর্যটকদের টেনে রাখে ঘন্টার পর ঘন্টা।
স্থানীয়দের আতিথেয়তা অসাধারণ। এক কাপ ঐতিহ্যবাহী তুর্কি চা হাতে বসে গল্প করতে করতে বুঝতে পারলাম, তুর্কি সংস্কৃতি কেবল ইতিহাস নয়, এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে গভীরভাবে প্রোথিত।
ইস্তানবুলে থাকাকালীন সময়ে অনেক বাংলাদেশি প্রবাসীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কেউ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছেন, কেউবা পড়াশোনা করছেন। বিদেশের মাটিতে দেশি মুখ দেখলে এক অদ্ভুত আপনভাব জেগে ওঠে।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে তাঁদের অনেকের সঙ্গে গভীর আলোচনা হয়েছিল। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে, ইস্তানবুল শুধু ইতিহাস নয়, অর্থনীতি ও বাণিজ্যের দিক থেকেও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ইস্তানবুলকে অনেকেই মনে করেন অন্যান্য ইউরোপীয় শহরের তুলনায় কিছুটা শান্ত। কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে শহরের প্রকৃত আকর্ষণ। ব্যস্ত নগরীর ভিড়ের মাঝেও শান্ত বসফরাস তীর, ঐতিহ্যবাহী মসজিদের আঙিনায় নীরব প্রার্থনা, আবার অন্যদিকে ঝলমলে রাতের বাজার — সবকিছু মিলিয়ে ইস্তানবুল এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

এটি এমন এক শহর যেখানে একইসঙ্গে ইউরোপ ও এশিয়ার ছোঁয়া পাওয়া যায়। বসফরাস ব্রিজ যেন দুই মহাদেশের হৃদয়কে সংযুক্ত করে রেখেছে।
এই সফরের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল নতুন সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। সরকারি কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও ইস্তানবুলের প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে।
ইতিহাস, স্থাপত্য, সংস্কৃতি, আতিথেয়তা এবং প্রবাসী জীবনের গল্প—সব মিলিয়ে ইস্তানবুল হয়ে উঠেছে আমার স্মৃতির ভাণ্ডারে এক অমূল্য সম্পদ।
ইস্তানবুল আমার কাছে কেবল একটি শহর নয়, বরং ইতিহাস ও আধুনিকতার মেলবন্ধনের এক জীবন্ত পাঠশালা। বসফরাসের তীর, স্পাইস বাজারের গন্ধ, তুর্কি আতিথেয়তা, প্রবাসী বাংলাদেশিদের গল্প — সবকিছু মিলে এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
যদিও এই পর্বে আমার ইস্তানবুল ভ্রমণের কেবল একটি অংশ শেয়ার করলাম, এখনও অনেক খুঁটিনাটি রয়ে গেছে। শিগগিরই সেইসব অভিজ্ঞতা নিয়েও লিখব।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ০২-সেপ্টেম্বর-২০২৫


