বাংলাদেশে নারী ক্রীড়াবিদদের পথচলা সহজ ছিল না। তবে অনেকেই নিজেদের দৃঢ়তা ও অনন্য সাফল্যের মাধ্যমে ইতিহাস রচনা করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন জুডো খেলোয়াড় ও প্রশিক্ষক নয়না চৌধুরী, যিনি শুধু একজন ক্রীড়াবিদ নন, বরং দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
নয়না চৌধুরীর জন্ম ১৯৭০ সালের ২৮ অক্টোবর, যশোর শহরের হাজী মোহাম্মদ মহসীন রোডে। তার পিতা ছিলেন শহীদুল ইসলাম চৌধুরী (নয়ন)। ছোটবেলা থেকেই তিনি খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। শিক্ষাজীবন শুরু করেন এমএসটিপি গার্লস স্কুল থেকে এবং পরবর্তীতে যশোরের এম এম কলেজে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে বিএ সম্পন্ন করেন ঢাকার ইডেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে।
নয়না চৌধুরী শুধুমাত্র দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।১৯৯৪ সালে জাপানের কোদোকান ইনস্টিটিউট থেকে জুডো কোচেস সার্টিফিকেট অর্জন করেন।১৯৯৪-৯৫ সালে ভারতের নেতাজী সুভাষ ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ স্পোর্টস, পাটিয়ালা, পাঞ্জাব থেকে জুডোতে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন।১৯৯৭-৯৮ সালে মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজ থেকে বি.পি.এড ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৮১ সালে যশোর বিডি হলে অনুষ্ঠিত এক কারাতে প্রদর্শনী থেকে নয়না চৌধুরীর খেলাধুলার প্রতি গভীর আগ্রহের জন্ম হয়। পরবর্তীতে শিক্ষক সৈয়দ আজমল হোসেন এবং জাপানি প্রশিক্ষক ইয়াসুহিকো এনদোসহ একাধিক আন্তর্জাতিক কোচের কাছ থেকে তিনি বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন।
তার ক্রীড়া ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন আসে ১৯৮৪ সালের ৩য় জাপান কাপে, যেখানে তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেন। এই প্রতিযোগিতা জেতার পরই তিনি বার্মা সফর করেন এবং বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশগ্রহণ করে দলকে চ্যাম্পিয়ন করতে সহায়তা করেন।১৯৮৪ সালে যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থা আয়োজিত জাতীয় জুডো প্রতিযোগিতায় -৪৪ কেজি ওজন শ্রেণীতে স্বর্ণপদক এবং উন্মুক্ত ওজনে রৌপ্যপদক লাভ করেন।১৯৮৫ ও ১৯৮৬ সালে টানা দুটি জাপান কাপে স্বর্ণপদক জেতেন।১৯৮৭ সালে উন্মুক্ত ৪৮ কেজি ওজন শ্রেণীতে স্বর্ণপদক লাভ করেন।১৯৮৮ সালে সিরিয়ার দামেস্কোতে অনুষ্ঠিত এশীয় জুডো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে পঞ্চম স্থান অর্জন করেন।
নয়না চৌধুরী ৫ম ড্যান ব্ল্যাক বেল্টধারী ছিলেন। জুডো ছাড়াও তিনি সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্য পান।১৯৯১ সালে “জিনাত মোশাররফ উন্মুক্ত সাইক্লিং প্রতিযোগিতা”-তে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন।১৯৯২ সালে বিটিএমসি’র হয়ে জাতীয় সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় একটি স্বর্ণ, একটি রৌপ্য ও একটি ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন।
১৯৮৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর যশোরে মেয়েদের জুডো প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তার প্রশিক্ষক জীবনের সূচনা ঘটে। পরবর্তীতে তিনি জাতীয় পর্যায়ে একজন জুডো প্রশিক্ষক ও রেফারি হিসেবে কাজ করেন। পাশাপাশি তিনি ভলিবল রেফারি (গ্রেড-বি) হিসেবেও স্বীকৃত ছিলেন।১৯৮৮ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত খেলোয়াড় হিসেবে বাংলাদেশ বস্ত্রকল করপোরেশনে কর্মরত ছিলেন।১৯৯৫ সালে তিনি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে জাতীয় প্রশিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।২০০০ সালের ৩ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্যাল ইন্সট্রাক্টর হিসেবে যোগদান করেন এবং দীর্ঘ সময় সেখানে দায়িত্ব পালন করেন।
নয়না চৌধুরীর ক্রীড়াজীবন নানা সম্মাননা ও স্বীকৃতিতে ভরপুর।১৯৮৫ সালে লায়ন্স ক্লাবের পুরস্কার পান, যা ছিল জুডোতে তার প্রথম স্বীকৃতি।১৯৯১ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি তাকে শ্রেষ্ঠ জুডোকা হিসেবে পুরস্কৃত করে।এছাড়াও তিনি বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হন।
নয়না চৌধুরী ছিলেন শুধু একজন খেলোয়াড় নয়, বরং বাংলাদেশের নারী ক্রীড়াঙ্গনের এক অনন্য প্রতীক। তার অবদান কেবল জুডোতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি নারী খেলোয়াড়দের জন্য এক শক্তিশালী অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিলেন। জুডোতে জাতীয় সাফল্য, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং প্রশিক্ষক হিসেবে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ০৩-সেপ্টেম্ববর ২০২৫


