লিওনেল মেসি শুধুমাত্র বার্সেলোনার জন্য নয়, আর্জেন্টিনার জার্সিতেও ফুটবল ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় তৈরি করেছেন। তার খেলার প্রতিটি মুহূর্তে ফুটবলপ্রেমীরা আনন্দ, দুঃখ, উত্তেজনা এবং আবেগের মিশ্রণ অনুভব করেছেন। আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম টিওআইস স্পোর্টসের লাউতালো আলভারেজের রচনা অনুসারে মেসির আর্জেন্টিনার মঞ্চে ১০টি মুহূর্ত যা বিশেষভাবে গভীর ছাপ ফেলেছে, সেগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো।
মেসির আর্জেন্টিনার জার্সিতে আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল জার্মানি বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচে। আর্জেন্টিনা পেরুকে ২-০ গোলে হারায়। মেসি পুরো ৯০ মিনিট খেলেন এবং রোমান রিকেলমেকে পাস দিয়ে একটি গোল করান। দেশে তার প্রথম বড় মঞ্চ হওয়া এই ম্যাচই ছিল তার দীর্ঘ জাতীয় দলের যাত্রার সূচনা।
সাউথ আফ্রিকা বিশ্বকাপ বাছাইয়ে উরুগুয়ের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করে মেসি আর্জেন্টিনার মাটিতে প্রথমবারের মতো নিজের ছাপ রেখে যান। এই গোলের মাধ্যমে আর্জেন্টাইন ভক্তদের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
২০১১ সালে আর্জেন্টিনার ঘরের মাঠে কোপা আমেরিকায় খারাপ ফলাফলের পর সমর্থকরা তিরস্কার করেছিল। বিশেষত সান্তা ফে অঞ্চলে উরুগুয়ের হাতে পরাজয়ের পর দর্শকদের ক্ষোভ মেসির ওপরেও চাপ সৃষ্টি করেছিল। এটি দেখিয়েছে, বড় খেলোয়াড় হওয়া মানেই শুধুমাত্র সাফল্য নয়, ব্যর্থতারও সঙ্গে মানিয়ে চলার চ্যালেঞ্জ।
প্রেস নিয়ে বিতর্কের পর মেসি ও আর্জেন্টিনা দলের কোচ নির্দিষ্ট কিছু সংবাদমাধ্যমকে বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেন। মেসি জানান, অনাবশ্যক চর্চা ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে দলের একজোট হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রিভার প্লেটে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র হয়। আর্জেন্টিনার জন্য এটি উদ্বেগের সংকেত। ম্যাচ শেষে দর্শকদের ক্ষোভ সরাসরি মেসির ওপর পড়ে। এই মুহূর্তটি দেখিয়েছে, যে কোন বড় খেলোয়াড়কেও চাপের মুখোমুখি হতে হয়।
দীর্ঘ ২৮ বছরের অপেক্ষার পর মেসির প্রথম আন্তর্জাতিক বড় শিরোপা আসে কোপা আমেরিকা ২০২১-এ। দেশের হয়ে জয়ের পর মেসির আবেগঘন কান্না ফুটবলপ্রেমীদের চোখে আজও ভাসে। এটি একটি মুহূর্ত যা প্রমাণ করে, তার জন্য আর্জেন্টিনার জার্সি মানেই শুধু খেলা নয়, এক হৃদয়স্পর্শী আবেগ।
কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনার মাঠে উৎসবের মধ্য দিয়ে মেসি ও ভক্তরা আনন্দ উদযাপন করেন। ২০২৩ সালের মার্চে প্যানামার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে মেসি তার ৮০০তম গোলও পূর্ণ করেন। সমর্থকদের সঙ্গে এই আনন্দঘন মুহূর্ত ছিল সত্যিই অনন্য।
মেসি অনুপস্থিত থাকলেও আর্জেন্টিনা ব্রাজিলকে ৪-১ গোলে হারায়। এটি প্রমাণ করে, দল মেসির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল নয়। একটি প্রতীকী মুহূর্ত যা বোঝায়, দলের মানসিক ও কৌশলগত শক্তি এখনও শক্তিশালী।
কলম্বিয়ার বিপক্ষে মেসি নিজের ইচ্ছায় বদলি নেন। এটি একটি সংকেত যে, তার শরীর আর আগের মতো স্থায়ী নয়। তবে এই মুহূর্তে দল শিখছে তার ছাড়া খেলার কৌশল, যা নতুন প্রজন্মের জন্য এক যুগান্তকারী শিক্ষা।
গত বছরের ১৫ অক্টোবর বলিভিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক এবং দুটি অ্যাসিস্টের মাধ্যমে মেসি আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ গোল করেন। এটি তার আর্জেন্টিনার সঙ্গে সম্পর্কের একটি আবেগঘন চূড়ান্ত অধ্যায়।
মেসি এবং আর্জেন্টিনার সম্পর্ক ছিল এক মিশ্র অনুভূতি: আনন্দ, দুঃখ, চাপ এবং উৎসব। ৪৯টি হোম ম্যাচে ৩৫ গোল, ১৯টি অ্যাসিস্ট শুধু সংখ্যাগত কাহিনি নয়; মাঠে তৈরি অনুভূতির একটি সমৃদ্ধ গল্প। তার খেলার প্রতিটি মুহূর্ত আর্জেন্টিনার ফুটবলপ্রেমীদের জন্য চিরস্মরণীয়।
আজকের ম্যাচ হতে পারে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, কিন্তু মেসি যে ছেড়েছেন এবং যা রেখে গেছেন, তা অনেকদিন ধরে ফুটবলপ্রেমীদের মনে বসবাস করবে।


