ভারতের মহারাষ্ট্রে এমন একটি স্কুল রয়েছে, যেখানে ভর্তির শর্তই আলাদা। এখানে ৬০ বছরের নিচে কেউ ভর্তি হতে পারবেন না, এমনকি পুরুষদেরও প্রবেশ নিষিদ্ধ। এই বিশেষ স্কুলটি কেবলমাত্র ঠাকুমা ও দিদিমাদের জন্য, যারা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নতুন করে শিক্ষার আলোয় নিজেদের আলোকিত করতে চান।
ষাটোর্ধ মহিলাদের জন্য নতুন জীবনের পাঠশালা
আমরা সাধারণত দেখি, দিদিমা-ঠাকুমারা প্রতিদিন নাতি-নাতনিদের স্কুলে পাঠাতে সাহায্য করেন—কখনও তাদের ব্যাগ গোছানো, কখনও টিফিন তৈরি করা। কিন্তু যদি বলা হয়, এই বৃদ্ধ বয়সে তারাও আবার স্কুলে ভর্তি হন, ইউনিফর্ম পরে, পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে ক্লাসে বসেন—শুনে কি অবাক লাগছে না?
তবুও এটাই সত্যি। মহারাষ্ট্রের থানের কাছে ফানগানে গ্রামে এমন এক অনন্য স্কুল রয়েছে, যেখানে ষাটোর্ধ মহিলারা নতুন করে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছেন।
শিক্ষার নতুন দরজা খুলে দিল আজিবাঈচি শালা
২০১৬ সালে স্থানীয় চিকিৎসক ডা. যোগেন্দ্র বাঙ্গার এক অভিনব উদ্যোগ নেন। তিনি বুঝতে পারেন, দেশের বহু মহিলাই ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাননি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মহিলাদের মধ্যে নিরক্ষরতার হার ছিল খুব বেশি।
এই পরিস্থিতি বদলাতে, ডা. বাঙ্গার ফানগানে গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন “আজিবাঈচি শালা”—যার অর্থ ঠাকুমা-দিদিমাদের স্কুল। এই স্কুলের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র একটাই—ষাটোর্ধ মহিলাদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া।
শুধু ষাটোর্ধ মহিলাদেরই ভর্তি
এই স্কুলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে ৬০ বছরের নিচে কারও ভর্তির অনুমতি নেই। পুরুষদেরও প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ভর্তি প্রক্রিয়াটি খুবই সরল, তবে বয়সের প্রমাণপত্র দেখাতে হয়।
এখানে ছাত্রীদের শেখানো হয়—পড়া-লেখা, অঙ্ক কষা, মৌলিক গণিত, সাধারণ জ্ঞান, প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও সমাজ সচেতনতা
ডা. বাঙ্গারের মূল লক্ষ্য, যেসব মহিলারা ছোটবেলায় পড়াশোনার সুযোগ পাননি, তাদের এখন সেই স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করা।
গোলাপি শাড়ির ইউনিফর্মে স্কুলের ভিন্ন আবহ
আজিবাঈচি শালার আরেকটি বিশেষত্ব হলো এর ইউনিফর্ম। এখানে ভর্তি হওয়া প্রত্যেক ঠাকুমা-দিদিমাকে পরতে হয় গোলাপি রঙের শাড়ি। পিঠে ছোট্ট ব্যাগ, হাতে খাতা-কলম—এই দৃশ্য যে কাউকে আবেগপ্রবণ করে তুলবে।
প্রতিদিন দুপুর ২টার মধ্যেই গোলাপি শাড়ি পরা ষাটোর্ধ মহিলারা স্কুলে হাজির হন। নতুন ক্লাসে বসার উত্তেজনা, নতুন কিছু শেখার আনন্দ—সবই এখানে অনুভব করা যায়।
কোভিডে বাধা, আবার নতুন উদ্যমে শুরু
স্কুলটি শুরু হওয়ার পর কয়েক বছর দারুণ সাফল্যের সাথে চললেও, কোভিড-১৯ মহামারির সময় কিছুদিনের জন্য পড়াশোনা বন্ধ রাখতে হয়েছিল। তবে মহামারি কেটে যাওয়ার পর নতুন উদ্যমে আবারও চালু হয় আজিবাঈচি শালা।
এবার ছাত্রীদের সংখ্যা আরও বেড়েছে। গ্রামের বহু মহিলাই এই স্কুলে ভর্তি হচ্ছেন এবং তাদের শেখার আগ্রহও তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মতিলাল দালাল চ্যারিটেবল ট্রাস্টের অবদান
এই উদ্যোগকে সফল করতে মতিলাল দালাল চ্যারিটেবল ট্রাস্ট এগিয়ে আসে। তারা শুধু অবকাঠামোগত সহায়তাই নয়, শিক্ষকদের পারিশ্রমিক, শিক্ষাসামগ্রী এবং ইউনিফর্মের খরচও বহন করে।
তাদের সহায়তায় আজিবাঈচি শালা দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং স্থানীয়দের মধ্যে একটি আলাদা পরিচিতি তৈরি করে।
ষাটোর্ধ মহিলাদের শিক্ষার নতুন আলোকবর্তিকা
আজিবাঈচি শালা শুধু একটি স্কুল নয়, বরং এটি এক ধরনের নারী ক্ষমতায়নের প্রতীক। এখানে যারা পড়তে আসেন, তাদের জীবনে নতুন করে আত্মবিশ্বাস, সম্মান এবং আত্মনির্ভরশীলতা তৈরি হয়।
অনেক ছাত্রী বলেন,
“আমরা ছোটবেলায় স্কুলে যেতে পারিনি। এখন মনে হচ্ছে, হারানো সময়টা কিছুটা হলেও ফিরে পাচ্ছি।”
উপসংহার
আজিবাঈচি শালা ভারতের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যেখানে ষাটোর্ধ ঠাকুমা-দিদিমারা আবারও শিক্ষার আলোয় নিজেদের জীবনকে আলোকিত করছেন। এই উদ্যোগ কেবল শিক্ষার প্রসারই নয়, সমাজে বয়স্ক মহিলাদের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গিরও জন্ম দিয়েছে।
যত বেশি এই ধরনের স্কুল ছড়িয়ে পড়বে, তত বেশি পিছিয়ে পড়া নারীরা নিজেদের জীবনের নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পাবেন।


