নেপালে চলমান ছাত্র-যুব আন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে এক নতুন মোড়ে দাঁড় করিয়েছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি-র পদত্যাগ এবং আত্মগোপনের পর নেপালের ক্ষমতার কেন্দ্রে এখন সেনাবাহিনী। এ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি-র নাম সামনে এসেছে। তবে সেনা এই প্রস্তাবে রাজি হবে কি না, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে।
ছাত্র-যুব আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
মঙ্গলবার সকাল থেকেই কাঠমান্ডুতে উত্তাল ছিল ছাত্র-যুব আন্দোলন। সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত এবং সমাজমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে হাজারো তরুণ-তরুণী রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে আত্মগোপন করেন। কিন্তু সরকারের পতনের পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। বরং নেপালের শাসনক্ষমতা আপাতত সেনার হাতে চলে গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে সুশীলা কার্কি
নতুন নেতৃত্বের খোঁজে বুধবার কাঠমান্ডুতে এক বিশেষ সভার আয়োজন করে আন্দোলনকারীরা। অনলাইনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যোগ দেন নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিরা। দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি-কেই মনোনীত করা হবে।
কার্কির কাছে প্রস্তাব পাঠানো হলে তিনি শর্ত দেন, অন্তত ১,০০০ আন্দোলনকারীর লিখিত স্বাক্ষর চাই। কিন্তু প্রস্তাব দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি ২,৫০০-র বেশি স্বাক্ষর পেয়ে যান। তবু সমস্যা এখানেই শেষ নয়। কারণ সেনাবাহিনী এই প্রস্তাবে সম্মতি দেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বলেন্দ্র শাহের নামও আলোচনায় ছিল
প্রথমদিকে অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান হিসেবে আলোচনায় আসে কাঠমান্ডুর জনপ্রিয় মেয়র এবং র্যাপার বলেন্দ্র শাহ-র নাম। তরুণ প্রজন্মের কাছে বলেন্দ্র অত্যন্ত জনপ্রিয় হওয়ায় তাঁকে সামনে আনার দাবি ওঠে। তবে পরবর্তীতে অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বগুণ এবং নিরপেক্ষতা বিবেচনা করে আন্দোলনকারীরা শেষ পর্যন্ত সুশীলা কার্কিকেই বেছে নেন।
সেনা কি মানবে এই প্রস্তাব?
যদিও আন্দোলনকারীরা ঐক্যমতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিন্তু নেপালের ক্ষমতার রাশ বর্তমানে সেনার হাতে। সেনা এই প্রস্তাব গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনী চাইবে স্থিতিশীলতা, আর সুশীলা কার্কির নিরপেক্ষ অবস্থান এ ক্ষেত্রে সুবিধাজনক হতে পারে। তবে সেনা যদি অস্বীকৃতি জানায়, তবে নেপালে আরও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে উত্তাল কাঠমান্ডু
ছাত্র-যুব আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তেই রাস্তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নেমে আসে পুলিশ। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
- পুলিশের গুলিতে ১৯ জন নিহত হয়েছে।
- ২৫০ জনের বেশি আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
- বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পুলিশ শূন্যে নয়, তাঁদের লক্ষ্য করেই গুলি চালিয়েছে।
- কাঠমান্ডুর বেশ কয়েকটি এলাকায় রাবারের বুলেট ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে আন্দোলনকারীদের মধ্যে।
সমাজমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা এবং এর প্রভাব
সম্প্রতি নেপাল সরকার ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, এক্স (টুইটার)-সহ ২৬টি সামাজিক মাধ্যমের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সরকারের দাবি, গুজব ও ভুয়ো তথ্য ঠেকাতেই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু তরুণ প্রজন্ম মনে করছে, এই পদক্ষেপ তাদের কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টা।
এই নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে সোমবার সকাল থেকেই হাজার হাজার ছাত্র-যুব আন্দোলনে অংশ নেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সামাজিক মাধ্যম নিষেধাজ্ঞাই নেপালে চলমান অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ।
পরিস্থিতি কোন পথে যাবে?
বর্তমানে নেপাল এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
- সুশীলা কার্কির নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে পারে।
- সেনা যদি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও গভীর হবে।
- সামাজিক মাধ্যমের নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ বাড়তে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেনা এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনার পথ খুলে দেওয়া এখনই জরুরি। অন্যথায় পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধের দিকেও গড়াতে পারে।


