নেপালের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি সম্প্রতি অজ্ঞাতবাস থেকে মুখ খুলেছেন। তিনি সরাসরি দাবি করেছেন, ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণেই তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। লিপুলেখ সীমান্ত বিরোধ থেকে শুরু করে রামের জন্মস্থান সংক্রান্ত মন্তব্য—প্রতিটি পদক্ষেপেই নয়াদিল্লিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন ওলি। তাঁর বক্তব্যে আবারও মাথাচাড়া দিয়েছে ভারত–নেপাল সম্পর্কের টানাপোড়েন।
লিপুলেখ বিতর্ক: সীমান্ত প্রশ্নে দ্বন্দ্ব
লিপুলেখ সীমান্ত ইস্যু বহুদিন ধরেই ভারত ও নেপালের কূটনৈতিক সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। দিল্লি যেখানকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে, ওলির সরকার সেটিকে নেপালের ভূখণ্ড বলে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে। এ বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ায় নয়াদিল্লি অসন্তুষ্ট হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন ওলি। তাঁর দাবি, সীমান্ত প্রশ্নে আপসহীন মনোভাবই তাঁর ক্ষমতা হারানোর অন্যতম কারণ।
অযোধ্যা ও রামের জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক
২০২০ সালের জুলাই মাসে কেপি শর্মা ওলি এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি দাবি করেন, ভগবান রামের জন্মস্থান ভারতের অযোধ্যা নয়, বরং নেপালের বীরগঞ্জের পশ্চিম দিকে অবস্থিত। এমনকি ভারতকে ‘ভুয়া অযোধ্যা’ তৈরি করার অভিযোগও আনেন তিনি।
ভারতের বিশেষজ্ঞরা তৎক্ষণাৎ এই দাবি নস্যাৎ করলেও, ওলির মন্তব্য দুই দেশের জনমনে চরম উত্তেজনা ছড়ায়। তাঁর ভাষায়, “অযোধ্যা প্রসঙ্গে সত্য উচ্চারণ করাতেই আমাকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছে।”
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার অভিযোগে ভারতের দিকে আঙুল
অজ্ঞাতবাসে থেকে নিজের দলের সাধারণ সম্পাদককে চিঠি লিখে ওলি জানিয়েছেন, ভারতের ক্ষোভের কারণেই তিনি গদি হারিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, দিল্লিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে শুধু ভারতের বিরোধিতা নয়, দুর্নীতির অভিযোগও তাঁকে চাপে ফেলে। সম্প্রতি নেপালের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন জি গোষ্ঠী দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে রাস্তায় নামে। এর জেরেই দেশজুড়ে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে।
নেপালে উত্তাল পরিস্থিতি ও সেনার হস্তক্ষেপ
ওলির পদত্যাগের পর নেপাল অস্থিরতায় ডুবে যায়। উত্তেজিত জনতা বহু নেতার বাড়িতে আগুন লাগায়, মন্ত্রীদের রাস্তায় টেনে বের করে মারধর করা হয়। জনরোষ দমাতে নেপাল সেনা কার্যত ক্ষমতা হাতে নেয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে দেশ চালানোর জন্য প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকির নাম ঘোষণা করেছে জেন জি। ফলে নেপালের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় ভরা।
ভারতের কড়া নজর
নেপালের পরিস্থিতির দিকে গভীরভাবে নজর রাখছে নয়াদিল্লি। ভারতের কূটনৈতিক মহল মনে করছে, সীমান্ত ও সাংস্কৃতিক ইস্যু নিয়ে ওলির উস্কানিমূলক বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে নতুন বিভাজন তৈরি করেছে। একইসঙ্গে নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ভারতীয় স্বার্থের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সমাপনী মন্তব্য
কেপি শর্মা ওলির দাবি ঘিরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। সীমান্ত ইস্যু থেকে রামের জন্মস্থান প্রসঙ্গ—প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তিনি নেপালের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে সমর্থন অর্জন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষমেশ সেটিই তাঁর গদি হারানোর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি তাঁর নিজের মুখে। বর্তমানে সেনার নিয়ন্ত্রণে থাকা নেপাল কোন পথে এগোয়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।


