রাজস্থানের আজমের শহরে ২০২২ সালে উদ্বোধন হয়েছিল এক অনন্য আকর্ষণ – সেভেন ওয়ান্ডার্স পার্ক। প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি এই পার্কে বিশ্বের বিখ্যাত স্থাপত্যগুলির রেপ্লিকা একসঙ্গে দেখা যেত। এর মধ্যে ছিল আইফেল টাওয়ার, পিরামিড, কলোসিয়াম, স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, পিসার হেলানো মিনার, ক্রাইস্ট দ্যা রিডিমার এবং ভারতের ঐতিহ্য তাজমহল।
উদ্বোধনের পর থেকেই এই পার্কে ভিড় জমতে শুরু করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের। বিশেষ করে পরিবার ও শিশুদের কাছে এই পার্কটি হয়ে উঠেছিল প্রিয় ভ্রমণস্থান। ছোটরা কাছ থেকে দেখে অবাক হত পৃথিবীর বিস্ময়কর স্থাপনাগুলির নিখুঁত রূপ।
তবে এই স্বপ্নের প্রকল্প বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০২৩ সালে বিজেপির কাউন্সিলর অশোক মালিক জাতীয় গ্রিন ট্রাইব্যুনালে (NGT) অভিযোগ জানান যে, এই পার্ক স্থানীয় জলাভূমি ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করছে। তিনি উল্লেখ করেন, দিঘির ধারে তৈরি এই বিশাল কাঠামো পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
পরবর্তীতে NGT স্পষ্ট নির্দেশ দেয় যে, শুধু সাত আশ্চর্যের রেপ্লিকা নয়, এর আশেপাশে থাকা প্যাটেল স্টেডিয়াম, গান্ধী স্মৃতি উদ্যান ও ফুড কোর্ট—সবকিছু ভেঙে ফেলতে হবে। কারণ এগুলো জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করছে এবং স্থানীয় পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
২০২৫ সালেও নির্দেশ কার্যকর না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয় দেশের শীর্ষ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট কঠোরভাবে জানায়, দ্রুততম সময়ে এই রেপ্লিকা ভাঙার কাজ সম্পন্ন করতে হবে। আদালতের অসন্তোষ প্রকাশের পর প্রশাসন অবশেষে উদ্যোগ নেয় এবং পার্ক ভাঙার কাজ শুরু হয়।
যে পার্কে গত তিন বছরে হাজার হাজার মানুষ বিশ্বের সাত আশ্চর্যের স্বাদ নিতে ভিড় জমাচ্ছিলেন, সেটি হারিয়ে যাওয়ায় পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই মনে করছেন, পরিবেশ রক্ষার জন্য আদালতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর ফলে শহরের এক বড় আকর্ষণ মুছে যাচ্ছে।
আজমেরের পর্যটন শিল্পে এই পার্কের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরিবারভিত্তিক ভ্রমণ, শিক্ষামূলক ট্যুর, এবং স্থানীয় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ফুড কোর্ট ও দোকানগুলো এই পার্ককে ঘিরেই সমৃদ্ধ হচ্ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, রেপ্লিকা ভেঙে ফেলার পর স্থানীয় অর্থনীতি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
যদিও সেভেন ওয়ান্ডার্স পার্ক একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, আদালতের নির্দেশে স্পষ্ট যে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থ সর্বাগ্রে। জলাভূমি ধ্বংস হলে দীর্ঘমেয়াদে যে ক্ষতি হতে পারত, তা রোধ করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
রাজস্থানের আজমেরের সেভেন ওয়ান্ডার্স পার্ক কিছু বছরের মধ্যেই ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের বিস্ময়কর স্থাপনাগুলির ক্ষুদ্র রূপ দেখতে পাওয়া গেলেও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা আদালতের কাছে বেশি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে একদিকে যেমন হারিয়ে গেল একটি পর্যটন আকর্ষণ, অন্যদিকে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
👉 মূল শিক্ষা: উন্নয়ন ও বিনোদনের প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে আদালতের কঠোর হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত সেই প্রকল্পের স্থায়িত্ব থাকে না।


