মানুষের ইতিহাসে এমন কিছু আবিষ্কার রয়েছে, যা পুরো মানবসভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছে। আগুন তার মধ্যে অন্যতম। আগুন শুধু আলো বা তাপের উৎস ছিল না, বরং খাদ্যাভ্যাস, নিরাপত্তা, সামাজিক জীবন এবং চিন্তাধারার ক্ষেত্রেও আমূল পরিবর্তন এনেছিল। এতদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, মানুষ প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে আগুন জ্বালানোর কৌশল রপ্ত করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা সেই ধারণাকে পুরোপুরি চ্যালেঞ্জ করেছে। নতুন আবিষ্কার বলছে, মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখেছিল তারও বহু আগে—প্রায় ৪ লক্ষ বছর পূর্বে।
মানববিবর্তনে আগুনের ভূমিকা
মানববিবর্তনের ইতিহাসে আগুনের ব্যবহার একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। আগুনের সাহায্যে আদিম মানুষ কাঁচা খাবার রান্না করতে পেরেছিল, ফলে খাবার সহজপাচ্য হয় এবং শরীরে বেশি শক্তি যোগান দেয়। এর পাশাপাশি আগুন রাতের অন্ধকার দূর করেছে, হিংস্র প্রাণী থেকে সুরক্ষা দিয়েছে এবং মানুষকে দলবদ্ধভাবে বসবাস করতে উৎসাহিত করেছে। বলা যায়, আগুনই মানুষকে প্রকৃত অর্থে সভ্যতার পথে এগিয়ে দেয়।
আগুন জ্বালানোর সময়কাল নিয়ে পুরনো ধারণা
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট মত ছিল যে, আধুনিক মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্স প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে আগুন জ্বালানো শিখেছিল। ফ্রান্সে পাওয়া কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের উপর ভিত্তি করেই এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সময় থেকেই পাঠ্যপুস্তক, গবেষণা প্রবন্ধ এবং সাধারণ জ্ঞানচর্চায় এই তথ্যই প্রচলিত ছিল।
নতুন গবেষণা কীভাবে বদলে দিল ধারণা
সম্প্রতি ব্রিটেনের ইংল্যান্ডের সাফক অঞ্চলে পরিচালিত এক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা মানবইতিহাসের এই অধ্যায়ে নতুন আলো ফেলেছে। গবেষকেরা সেখানে এমন কিছু ঝলসানো মাটি ও পাথরের সন্ধান পেয়েছেন, যা স্পষ্টভাবে আগুনের ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়। এই পাথরগুলিতে আগুনের উত্তাপে ফাটল ধরেছিল, যা প্রাকৃতিক আগুনের তুলনায় নিয়ন্ত্রিত আগুন ব্যবহারের প্রমাণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
আয়রন পাইরাইট ও চকমকি পাথরের গুরুত্ব
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আয়রন পাইরাইট নামের একটি খনিজের সন্ধান। আয়রন পাইরাইট এমন একটি পদার্থ, যা চকমকি পাথরের সঙ্গে ঘর্ষণ করলে আগুনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়। গবেষকেরা লক্ষ্য করেন, এই আয়রন পাইরাইট ও চকমকি পাথর একসঙ্গে ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে আগুন জ্বালানো হয়েছিল।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এই আগুন জ্বালানোর ঘটনাটি প্রায় ৪ লক্ষ বছর আগে ঘটেছিল। অর্থাৎ, আধুনিক মানুষের অনেক আগেই আদিম মানবগোষ্ঠী আগুন জ্বালানোর কৌশল জানত।
নিয়ান্ডারথাল ও আগুনের ব্যবহার
এই সময়ে পৃথিবীতে বসবাস করত নিয়ান্ডারথাল আদিম মানুষ। এতদিন ধারণা ছিল, নিয়ান্ডারথালরা তুলনামূলকভাবে কম উন্নত ছিল। কিন্তু এই নতুন প্রমাণ দেখাচ্ছে, তারা শুধু আগুন ব্যবহার করত না, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন জ্বালানোর প্রযুক্তিও জানত।
গবেষকেরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করেছেন। আয়রন পাইরাইটের যে টুকরোগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলো ওই অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় না। এর অর্থ হলো, নিয়ান্ডারথালরা সচেতনভাবে অন্য স্থান থেকে এই খনিজ সংগ্রহ করে এনেছিল। তারা জানত, এই পাথর চকমকি পাথরের সঙ্গে ঘষলে আগুন জ্বলে উঠবে।
পরিকল্পনা ও বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ
এই আবিষ্কার শুধু আগুন জ্বালানোর সময়কালই বদলায়নি, বরং আদিম মানুষের বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কেও নতুন ধারণা দিয়েছে। অন্য জায়গা থেকে নির্দিষ্ট খনিজ সংগ্রহ করে আনা মানে পরিকল্পনা, স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতার ব্যবহার। এটি প্রমাণ করে, ৪ লক্ষ বছর আগের মানুষরা পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন ছিল এবং ভবিষ্যৎ প্রয়োজন মাথায় রেখে কাজ করত।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এর প্রভাব
এই গবেষণার ফলাফল মানববিবর্তনের ইতিহাস নতুন করে লিখতে বাধ্য করছে বিজ্ঞানীদের। আগুন জ্বালানো শেখা যদি এত প্রাচীন হয়ে থাকে, তবে মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশও ধারণার চেয়ে অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। এর প্রভাব পড়বে নৃতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব এবং বিবর্তনবিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্বে।
ভবিষ্যৎ গবেষণার নতুন দিশা
এই আবিষ্কার গবেষকদের সামনে নতুন প্রশ্নও তুলে ধরেছে। যদি ইউরোপে ৪ লক্ষ বছর আগে আগুন জ্বালানোর প্রমাণ মেলে, তবে আফ্রিকা বা এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে আরও পুরনো নিদর্শন পাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভবিষ্যতে আরও গভীর গবেষণা মানবইতিহাসের আরও অজানা অধ্যায় উন্মোচন করতে পারে।


