ভারতের মাটিতে এমন কিছু উৎসব আছে, যেগুলি শুধু আনন্দের নয়—সেগুলি বিশ্বাস, সংস্কৃতি আর ইতিহাসের গভীর গল্প বলে। ঠিক তেমনই এক আশ্চর্য উৎসব পালিত হয় হিমাচল প্রদেশের কিন্নর জেলায়। নাম রাউলান উৎসব। শুনলে অবাক লাগবে, এই উৎসবের ইতিহাস প্রায় ৫ হাজার বছরের পুরনো। সময় বদলেছে, পৃথিবী বদলেছে, কিন্তু এই উৎসব আজও একই রকম আড়ম্বর আর মর্যাদায় পালিত হয়।
মুখোশ পরে প্রতীকী বিয়ে, বর-কনে দু’জনেই পুরুষ
রাউলান উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল এর প্রতীকী বিয়ে। এখানে সত্যিকারের নয়, প্রতীকী বিয়ে হয়। আর সেই বিয়েতে বর ও কনে—দু’জনেই পুরুষ। একজন সাজেন বর হিসেবে, যাঁকে বলা হয় ‘রাউলা’। অন্যজন সাজেন কনের বেশে, তাঁর নাম ‘রাউলান’।
এই বিয়ের সাজ একেবারেই আলাদা। দু’জনের মুখই ঢাকা থাকে। একজনের মুখ ঢাকা থাকে পোশাকে, আর অন্যজনের মুখ ঢেকে দেওয়া হয় অলঙ্কারে। বিশেষ করে রাউলানকে অলঙ্কারে এমনভাবে সাজানো হয়, যেন তিনি সত্যিই কোনও স্বর্গীয় সত্তা।
স্বর্গের পরী ‘সাউনি’ আর মানুষের বিশ্বাস
এই প্রতীকী বিয়ের পেছনে রয়েছে এক গভীর বিশ্বাস। কিন্নর অঞ্চলের মানুষের ধারণা, স্বর্গের পরীরা যাঁদের বলা হয় ‘সাউনি’, তাঁরা এই বিয়ের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে যুক্ত হন। রাউলা ও রাউলান হয়ে ওঠেন সেই সাউনি পরীদের বাহন।
স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী, সাউনি পরীদের ভূমিকা তাঁদের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রবল ঠান্ডা, তুষারঝড় আর প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে কীভাবে বেঁচে থাকতে হবে—এই জ্ঞান নাকি সাউনি পরীরাই মানুষকে শিখিয়েছিলেন। তাই তাঁদের খুশি করতেই এই উৎসব, এই বিয়ে, এই নৃত্য।
নাগিন নারায়ণ মন্দিরে ধর্মীয় নৃত্য
রাউলান উৎসবের মূল আয়োজন হয় নাগিন নারায়ণ মন্দিরের সামনে। উলের ভারী পোশাক গায়ে দিয়ে, মুখ ঢাকা অবস্থায় রাউলা ও রাউলান এক বিশেষ ধর্মীয় নৃত্যে অংশ নেন। সেই নৃত্য শুধু চোখের আনন্দ নয়, তা আসলে প্রার্থনারই আরেক রূপ।
চারপাশে গ্রামের মানুষ জড়ো হন। ঢাক, ঢোল, স্থানীয় বাদ্যের তালে তালে পুরো এলাকা যেন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। পাহাড়ি হাওয়ার সঙ্গে মিশে যায় বিশ্বাস আর ভক্তির আবেশ।
৫ হাজার বছরের পরম্পরা, আজও অটুট
কথিত আছে, প্রায় ৫ হাজার বছর আগেও কিন্নর অঞ্চলে এই রাউলান উৎসব পালিত হত। তখনও মানুষের জীবন ছিল প্রকৃতিনির্ভর, কঠিন আর সংগ্রামে ভরা। সেই সময় থেকেই মানুষ তাঁদের রক্ষকদের সম্মান জানাতে এই উৎসব পালন করে আসছে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও এই উৎসবের মূল রীতিনীতিতে কোনও পরিবর্তন আসেনি। আজও গ্রামবাসীরা একই নিয়ম, একই বিশ্বাস নিয়ে রাউলান উৎসব পালন করেন। এখানকার মানুষের কাছে এটি শুধু উৎসব নয়, তাঁদের পরিচয়ের অংশ।
হিমালয়ের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতীক
রাউলান উৎসব শুধু কিন্নর জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আসলে গোটা হিমালয় অঞ্চলের প্রাচীন সংস্কৃতি ও পরম্পরার প্রতীক। এখানে স্বর্গীয় ভাবনা আর মানবজীবনের বাস্তবতা একসঙ্গে মিশে যায়।
একদিকে পরীদের কাহিনি, অন্যদিকে পাহাড়ি মানুষের দৈনন্দিন লড়াই—এই দুইয়ের মিলনই রাউলান উৎসবকে আলাদা করে তোলে। তাই গবেষক আর সংস্কৃতিবিদদের কাছেও এই উৎসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বসন্তের শুরুতেই উৎসবের আয়োজন
রাউলান উৎসব সাধারণত হোলির পর, অর্থাৎ বসন্তের শুরুতে পালিত হয়। শীতের রুক্ষতা তখন একটু একটু করে কমতে শুরু করে। প্রকৃতি নতুন করে প্রাণ পায়। এই সময়েই মানুষ তাঁদের রক্ষকদের ধন্যবাদ জানাতে উৎসবে মেতে ওঠেন।
গ্রামের ছোট-বড় সবাই এই উৎসবে অংশ নেন। কেউ নাচেন, কেউ গান করেন, কেউ আবার শুধু দাঁড়িয়ে দেখে এই প্রাচীন রীতির সাক্ষী হন।
আধুনিক সময়েও কেন এত গুরুত্ব?
আজকের দিনে দাঁড়িয়েও রাউলান উৎসবের গুরুত্ব কমেনি। কারণ এই উৎসব মানুষকে মনে করিয়ে দেয় তাঁদের শিকড়ের কথা। প্রযুক্তির যুগে থেকেও কিন্নরের মানুষ ভুলে যাননি তাঁদের বিশ্বাস, তাঁদের ইতিহাস।
এই উৎসব প্রমাণ করে, সংস্কৃতি শুধু বইয়ের পাতায় বেঁচে থাকে না। তা বেঁচে থাকে মানুষের আচরণে, বিশ্বাসে আর উৎসবে।
শেষ কথা
রাউলান উৎসব শুধুই এক অদ্ভুত বিয়ের গল্প নয়। এটি হাজার হাজার বছরের বিশ্বাসের প্রতিফলন। স্বর্গের পরীদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান—সবকিছুরই ছাপ রয়েছে এই উৎসবে।
আজও যখন কিন্নরের পাহাড়ে মুখোশধারী রাউলা ও রাউলানের নাচ শুরু হয়, তখন যেন সময় থমকে যায়। ৫ হাজার বছরের ইতিহাস নতুন করে প্রাণ পায়। আর সেই কারণেই রাউলান উৎসব আজও সমান ঝলমলে, সমান জীবন্ত।


