জাতীয় নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই কৌশলগত সিদ্ধান্তে বড় পরিবর্তন আনছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নির্বাচনী মাঠে ‘ধানের শীষের’ জয় নিশ্চিত করতেই দলটি মনোনয়ন তালিকায় একের পর এক রদবদল করছে। এরই অংশ হিসেবে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সম্ভাব্য তিনটি আসনে বিকল্প প্রার্থী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে অন্তত ১৫টি আসনে প্রার্থী পরিবর্তন করেছে দলটি, যা নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
খালেদা জিয়ার তিন আসন ও বিকল্প প্রস্তুতির কৌশল
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়া বগুড়া, দিনাজপুর ও ফেনী—এই তিনটি আসনে নির্বাচন করার প্রস্তুতি হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। তবে তার বর্তমান শারীরিক অবস্থার কথা মাথায় রেখে প্রতিটি আসনেই বিকল্প প্রার্থী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন, আর দলীয় নেতারা বলছেন—তিনি একটি সংকটময় সময় পার করছেন।
রাজনীতিতে এমন প্রস্তুতি নতুন কিছু নয়। অনেক সময় বড় নেতার অনুপস্থিতিতে যাতে দল সাংগঠনিকভাবে দুর্বল না পড়ে, সেজন্য আগেভাগেই বিকল্প ভাবনা রাখা হয়। বিএনপিও এবার সেই পথেই হাঁটছে।
ফেনী, বগুড়া ও দিনাজপুরে কারা বিকল্প প্রার্থী
ফেনী-১ আসনে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম (মজনু)-কে। প্রয়োজনে তিনিই এই আসনে দলের প্রার্থী হতে পারেন।
বগুড়া-৭ (গাবতলী) আসনে বিকল্প হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোরশেদ আলম। অন্যদিকে দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে প্রস্তুত রয়েছেন সাবেক পৌর মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম। তারা দুজনই জানিয়েছেন, দলীয় উচ্চপর্যায়ের নির্দেশেই নিজেদের জন্য মনোনয়নপত্র নেওয়া হয়েছে।
তারেক রহমানের নির্বাচনী পরিকল্পনা চূড়ান্ত
একই সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনী পরিকল্পনাও চূড়ান্ত হয়েছে। তিনি বগুড়া-৬ (সদর) আসনের পাশাপাশি ঢাকা-১৭ (গুলশান–বনানী–ক্যান্টনমেন্ট) আসন থেকেও নির্বাচন করবেন। ঢাকা-১৭ আসনের প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবদুস সালামকে।
এর আগে এই আসনে জোটপ্রার্থী হিসেবে প্রচার শুরু করা আন্দালিভ রহমান পার্থ এখন ভোলা সদর আসনে নির্বাচন করবেন। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আসনভিত্তিক সমীকরণ নতুন করে সাজাচ্ছে বিএনপি।
ঢাকা অঞ্চলে মনোনয়ন পরিবর্তন ও জোট সমঝোতা
ঢাকা অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি মনোনয়ন পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির ঘোষিত প্রার্থী সাইফুল আলম নীরবের পরিবর্তে যুগপৎ আন্দোলনের মিত্র বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে প্রার্থী করা হয়েছে। তিনি ‘কোদাল’ প্রতীকে নির্বাচন করবেন।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে ব্যবসায়ী মো. মাসুদুজ্জামানের অনীহার কারণে সেখানে বিএনপির সাবেক মহানগর সভাপতি আবুল কালামকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এসব সিদ্ধান্তে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে জোটগত রাজনীতির বাস্তবতা।
চট্টগ্রামে নাটকীয় রদবদল ও সাংগঠনিক সংকট
চট্টগ্রাম অঞ্চলে এসেছে সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন। রাউজান (চট্টগ্রাম-৬) আসনে গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবর্তে গোলাম আকবর খন্দকারকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান পদ স্থগিত করা হয়। পাশাপাশি গোলাম আকবরের নেতৃত্বাধীন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয়।
দলীয় সূত্র জানায়, তারেক রহমানের সঙ্গে সাম্প্রতিক মতবিনিময় সভাতেও গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ডাকা হয়নি। এতে বোঝা যায়, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও মাঠের পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল।
চট্টগ্রামের অন্যান্য আসনে নতুন মুখ
চট্টগ্রাম-১৪ আসনটি আগে এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমদের ছেলে ওমর ফারুকের জন্য ফাঁকা রাখা হলেও রাজনৈতিক জোট পরিবর্তনের কারণে সেখানে বিএনপি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জসিমউদ্দিনকে প্রার্থী করেছে।
চট্টগ্রাম-৪ আসনে কাজী সালাহউদ্দিনের পরিবর্তে আসলাম চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আর চট্টগ্রাম-১১ থেকে সরিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে চট্টগ্রাম-১০ আসনে প্রার্থী করা হয়েছে। চট্টগ্রাম-১১ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে সাঈদ আল নোমান।
উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পরিবর্তনের হাওয়া
উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমানের ঋণখেলাপি জটিলতার কারণে সেখানে বিএনপির নেতা মীর শাহে আলমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে সাবেক সচিব মুশফিকুর রহমানের বদলে কবির আহমেদ ভূঁইয়াকে প্রার্থী করা হয়েছে। মুন্সিগঞ্জ-২ আসনে একমি গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান সিনহার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আবদুস সালাম আজাদ মনোনয়ন পেয়েছেন। মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মো. মহিউদ্দিন আহমেদকে প্রার্থী করা হয়েছে।
নড়াইল, যশোর ও মাদারীপুরে নতুন সমীকরণ
ঝিনাইদহ-১ আসনে সদ্য পদত্যাগ করা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানকে প্রার্থী করা হয়েছে। নড়াইল-২ আসনে বিএনপির প্রার্থীর পরিবর্তে জোটসঙ্গী ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
যশোর-১, যশোর-৫ ও যশোর-৬ আসনেও দলীয় ও জোটগত সমীকরণে নতুন প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত হয়েছে। মাদারীপুর-১ আসনে কামাল জামাল মোল্লার বদলে নাদিরা আক্তারকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
৩০০ আসনের মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত
বিএনপি দুই দফায় ২৭২ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করলেও পরে মিত্রদের জন্য আরও ১৫টি আসন ছেড়ে দেয়। বাকি আসনগুলোর মনোনয়নও চূড়ান্ত হলেও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও আসেনি। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, তার জানা মতে ৩০০ আসনের মনোনয়নই চূড়ান্ত হয়েছে।
তার ভাষায়, প্রতিদিন একাধিক পরিবর্তনের কারণে একসঙ্গে তালিকা প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, ততই বাস্তবতা বদলায়। পরিস্থিতি ও সমীকরণ অনুযায়ী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসাই স্বাভাবিক।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে বলা যায়, এবারের নির্বাচনে বিএনপি কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। মাঠের বাস্তবতা, জোটের হিসাব এবং জনমতের প্রতিফলন—সব কিছু বিবেচনায় রেখেই তারা প্রার্থী তালিকা নতুন করে সাজাচ্ছে। খালেদা জিয়ার তিন আসনে বিকল্প প্রার্থী প্রস্তুত রাখা সেই কৌশলেরই বড় উদাহরণ। এখন দেখার বিষয়, এই হিসাব-নিকাশ শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সে কতটা প্রভাব ফেলে।


