বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬
20.9 C
Jessore
More

    গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক: খালেদা জিয়ার জীবন, রাজনীতি ও বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর অনন্য ভূমিকা

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে কয়েকটি নাম উচ্চারিত হলেই পুরো একটা সময় চোখের সামনে ভেসে ওঠে, খালেদা জিয়া তাঁদের মধ্যে অন্যতম। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার পথটা মোটেও সহজ ছিল না। ব্যক্তিগত শোক, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন, আন্দোলন, ক্ষমতা, বিরোধিতা, কারাবাস আর দীর্ঘ অসুস্থতা—সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার জীবন ছিল নাটকীয় ও ঘটনাবহুল।

    সাধারণ জীবন থেকে রাজনীতির কেন্দ্রে

    খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতে। তাঁর বাবার নাম ইস্কান্দর মজুমদার, মায়ের নাম তৈয়বা মজুমদার। পরিবারিক ডাকনাম ছিল ‘পুতুল’। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তাঁদের আদি নিবাস ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায় হলেও পরিবার পরে দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।

    ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই তিনি খালেদা জিয়া নামেই পরিচিত হন। তখন তাঁর জীবনের মূল পরিচয় ছিল একজন সংসারী নারী, দুই সন্তান—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে ঘিরেই ছিল তাঁর পৃথিবী।

    স্বামীর মৃত্যু ও জীবনের মোড় ঘোরা

    ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে খালেদা জিয়ার জীবন হঠাৎ করেই পাল্টে যায়। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন। সেই সময় তিনি রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না। এমনকি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থাতেও তাঁকে কোনো রাজনৈতিক ভূমিকায় দেখা যায়নি।

    আরও পড়ুন :  সারাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ১৭,৫৫৬! ঢাকায় সবচেয়ে বেশি কেন?

    কিন্তু ঠিক এই শোক আর শূন্যতার মধ্যেই বিএনপি ভয়াবহ সংকটে পড়ে। দলের ভেতরে কোন্দল শুরু হয়, অনেক নেতা সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সঙ্গে যোগ দেন। দল প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। তখন দলের নেতারাই খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আসার অনুরোধ জানান।

    বিএনপির হাল ধরা ও নেতৃত্বে উত্থান

    ১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। প্রথমে তাঁকে ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। মাত্র এক বছরের মধ্যেই, ১৯৮৪ সালের ১০ মে, তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। একজন গৃহবধূ থেকে বড় একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আসা—সে সময়ের বাংলাদেশে এটি ছিল বিরল ঘটনা।

    অনেকে তখন বলেছিলেন, তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে রাজনীতিতে এসেছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খালেদা জিয়া প্রমাণ করেন, শুধু পরিচয়ের জোরে নয়, নিজের সিদ্ধান্ত আর নেতৃত্ব দিয়েই তিনি টিকে আছেন।

    এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও আপোষহীন নেতৃত্ব

    খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে ওঠে মূলত এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০—এই দীর্ঘ নয় বছর তিনি রাজপথে ছিলেন। ১৯৮৩ সালে তিনি সাত দলীয় জোট গঠন করে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন।

    যখন অনেক দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথে হাঁটছিল, তখন খালেদা জিয়া নির্বাচন বর্জন করে আন্দোলন চালিয়ে যান। এই অবস্থানই তাঁকে “আপোষহীন নেত্রী” হিসেবে পরিচিত করে তোলে। এই সময়ে তাঁকে তিনবার গ্রেপ্তারও করা হয়।

    প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও সংসদীয় ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন

    ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি পাঁচটি আসনে নির্বাচন করে সবগুলোতেই জয়ী হন, যা তাঁর জনপ্রিয়তার বড় প্রমাণ।

    আরও পড়ুন :  মাজারে হামলা ও মব সন্ত্রাস: আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের মুখে সরকার

    এই সরকারের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল। দীর্ঘ ১৬ বছর পর রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা বাতিল করে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে আসে বাংলাদেশ। এই সিদ্ধান্তে সব দলের ঐকমত্য ছিল, আর নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া।

    ক্ষমতা, বিরোধিতা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলন

    প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবিতে তীব্র আন্দোলনের মুখে পড়ে বিএনপি সরকার। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে আবার সরকার গঠন হলেও সেই সংসদ টিকে ছিল মাত্র ১২ দিন। পরে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হয়।

    এরপরের নির্বাচনে খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসেন। ২০০১ সালে আবার ক্ষমতায় ফিরে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন তিনি।

    জোট রাজনীতি ও সমালোচনা

    খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি জামায়াতে ইসলামিসহ কয়েকটি দলকে নিয়ে চার দলীয় জোট গঠন করে, যা পরে ২০ দলীয় জোটে রূপ নেয়। এই জোটে ধর্মভিত্তিক দলের আধিক্য নিয়ে সমালোচনা ছিল ব্যাপক। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এটি ছিল সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল।

    Images 10000 08
    ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে কারাগার থেকে বেরিয়েই হাসপাতালে অসুস্থ তারেক রহমানকে দেখতে যান খালেদা জিয়া। পরে মি. রহমান চিকিৎসার জন্য ব্রিটেনে চলে যান (ফাইল চিত্র)

    কারাবাস, সাজা ও দীর্ঘ অসুস্থতা

    ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এবং ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খালেদা জিয়াকে কারাগারে যেতে হয়। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তাঁর ১৭ বছরের সাজা হয়।

    আরও পড়ুন :  আওয়ামী লীগকে ঘিরে পুলিশের সতর্কবার্তা: বিশেষ নজরদারি ও অভিযান ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত

    দীর্ঘদিন কারাবাসের ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থা মারাত্মকভাবে খারাপ হয়ে যায়। তিনি লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা, ডায়াবেটিস ও আর্থরাইটিসে ভুগছিলেন। ২০২৪ সালে তাঁর হৃদপিণ্ডে পেসমেকার বসানো হয় এবং লিভারের জটিল চিকিৎসাও নেওয়া হয়।

    মুক্তি, সীমিত রাজনীতি ও শেষ সময়

    ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। এরপর তিনি সীমিত আকারে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন। বয়স ও অসুস্থতার কারণে তিনি আর আগের মতো সক্রিয় ছিলেন না।

    ২০২৫ সালে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগের অবসান ঘটায়।

    ইতিহাসে খালেদা জিয়ার স্থান

    খালেদা জিয়া শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সংগ্রামী নারী, যিনি পুরুষশাসিত রাজনীতিতে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে এসেছে, বিরোধী রাজনীতিতে এসেছে দৃঢ়তা, আর বাংলাদেশের রাজনীতি পেয়েছে এক শক্তিশালী নারী কণ্ঠ।

    ভালো-মন্দ মিলিয়েই ইতিহাস তৈরি হয়। খালেদা জিয়ার জীবনও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু একজন গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার গল্পটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে চিরকাল আলাদা গুরুত্ব নিয়ে স্মরণ করা হবে।

    লেটেস্ট আপডেট

    শাড়ির ব্যবসার আড়ালে আতশবাজির কারবার, ৫ বস্তা ও ৫ কার্টুন জব্দ

    যশোর শহরের বড় বাজারের হাটচান্নী মার্কেটে শাড়ির ব্যবসার আড়ালে...

    সংসদ নির্বাচন; যশোরের ৮২৪ কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ৩০২টি, অতি গুরুত্বপূর্ণ ৭১

    রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যশোরের ছয়টি আসনে...

    যুক্তরাজ্যের চাপে অ্যাপল–গুগলের বড় সিদ্ধান্ত! অ্যাপ স্টোরে আসছে নতুন নিয়ম

    যুক্তরাজ্যে প্রযুক্তি খাতে বড় একটি পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার।...

    টেক্সাসে ভয়াবহ পারিবারিক দ্বন্দ্ব: রাজনৈতিক তর্কের পর মেয়েকে গুলি করলেন বাবা

    পরিবারের মধ্যে তর্ক বা মতবিরোধ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।...

    ভোটের হারেই নির্ধারিত হবে ক্ষমতার সমীকরণ: বিএনপি বনাম জামায়াতের রাজনৈতিক লড়াই

    বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির মাঠ এখন...

    বাছাই সংবাদ

    শাড়ির ব্যবসার আড়ালে আতশবাজির কারবার, ৫ বস্তা ও ৫ কার্টুন জব্দ

    যশোর শহরের বড় বাজারের হাটচান্নী মার্কেটে শাড়ির ব্যবসার আড়ালে...

    সংসদ নির্বাচন; যশোরের ৮২৪ কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ৩০২টি, অতি গুরুত্বপূর্ণ ৭১

    রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যশোরের ছয়টি আসনে...

    সোশাল মিডিয়ায় ডিপফেক আর চলবে না: ৩ ঘণ্টার নিয়মে কড়া বার্তা সরকারের

    ডিপফেক ভিডিও, ভুয়ো ছবি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বিভ্রান্তিকর...

    যশোরের ছয় আসনে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ছক, ৮২৪ ভোটকেন্দ্রেই সিসি ক্যামেরা স্থাপন

    আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে...

    ভোটের দিন নিরাপত্তা নিয়ে বড় বার্তা! ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ও পুলিশের প্রস্তুতি জানালেন ডিআইজি

    এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশ শটগানে শুধুমাত্র রাবার বুলেট...
    00:01:45

    নড়াইলে প্রেস ব্রিফিং: নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তায় পুলিশের বিশেষ প্রস্তুতি জানালেন ডিআইজি

    আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ ঘিরে নড়াইলসহ...

    তীব্র আপত্তির পর সিদ্ধান্ত বদল! ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিয়ে নতুন ঘোষণা ইসির

    নানা সমালোচনা ও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের আপত্তির পর ভোটকেন্দ্রে...

    যশোরের তরুণদের জন্য বড় ঘোষণা: মেধা ও যোগ্যতাই হবে চাকরির একমাত্র শর্ত

    যশোর-৩ (সদর) আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী অনিন্দ্য...

    এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

    জনপ্রিয় ক্যাটাগরি

    Translate »