বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যাঁর নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, তিনি বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপির চেয়ারপারসন, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক এই নেত্রী আর আমাদের মাঝে নেই। তাঁর মৃত্যু সংবাদে দেশজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এই লেখায় খালেদা জিয়ার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো সহজভাবে তুলে ধরা হলো, যেন একজন মানুষ হিসেবে তাঁর পথচলাটা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
খালেদা জিয়ার জন্ম ও শৈশবকাল
বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম সাল নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। বিএনপির দলীয় ওয়েবসাইট অনুযায়ী তাঁর জন্ম ১৯৪৬ সালে। তবে ‘নন্দিত নেত্রী: খালেদা জিয়া’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট। জন্মস্থান ছিল তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুঁড়ি জেলার নয়াবস্তি এলাকা।
শরতের এক শান্ত ভোরে তাঁর জন্ম। পরিবারে আনন্দের আবহ ছিল। শৈশবে তাঁর পারিবারিক নাম ছিল খালেদা খানম। ডাকনাম হিসেবে পরিচিত ছিলেন পুতুল নামে। পরিবারে আরও কয়েকটি নামেও তাঁকে ডাকা হতো—টিপসি ও শান্তি। সেই সময় বিশ্বযুদ্ধ শেষের পর মানুষ শান্তির আশায় ছিল, আর সেই ভাবনা থেকেই ‘শান্তি’ নামটি ছড়িয়ে পড়ে।
পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন
খালেদা জিয়ার পৈতৃক বাড়ি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায়। তাঁর বাবা ইস্কান্দর মজুমদার এবং মা বেগম তৈয়বা মজুমদার। তিনি ছিলেন পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয়। জীবনের পরবর্তী সময়ে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে পরিচিত হন।
তিনি দুই সন্তানের জননী—তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো। পরিবারকে ঘিরেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবন আবর্তিত ছিল, যদিও রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় সেই জীবন খুব একটা সহজ ছিল না।
রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার প্রবেশ
খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা অনেকটা সময়ের প্রয়োজনে। স্বামী জিয়াউর রহমান হত্যার পর তিনি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় হন। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর নেতৃত্বগুণ সবার নজরে আসে।
১৯৮৩ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সেদিন থেকেই তিনি বিএনপির নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে।
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব
খালেদা জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন—১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে।
১৯৯১ সালে নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। তাঁর নেতৃত্বেই সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা ফিরে আসে।
১৯৯৬ সালে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি স্বল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পরে সেই বছর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হলে তিনি বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন।
২০০১ সালে চারদলীয় ঐক্যজোটের নেতৃত্বে আবারও ক্ষমতায় ফেরেন খালেদা জিয়া। এই মেয়াদে তিনি পূর্ণ পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বিরোধী রাজনীতি ও আন্দোলনের সময়
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর তিনি আবার বিরোধী দলের নেত্রী হন। ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। পরবর্তী সময়েও রাজনৈতিক সংকট, আন্দোলন এবং নির্বাচন ঘিরে নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে।
২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় তিনি কারাগারে থাকায় সরাসরি অংশ নিতে পারেননি। এমনকি সেই নির্বাচনে জিয়া পরিবারের কেউই প্রার্থী হননি। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও বিএনপি অংশ নেয়নি।
কারাবাস ও আইনি লড়াই
খালেদা জিয়ার জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে আইনি লড়াই ও কারাবাস। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে আবার কারাগারে যেতে হয় তাঁকে।
কারাবাসের সময় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে বিশেষ ব্যবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। করোনাভাইরাস মহামারির সময় শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান তিনি। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর অবশেষে তিনি চিরবিদায় নেন।
শেষ সময়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড
২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর ছিল তাঁর শেষ বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি। সেখানে তিনি ত্রাণ বিতরণ করেন। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে কারাগারে যাওয়ার আগে শেষ সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি।
এরপর আর জনসম্মুখে সক্রিয় রাজনীতিতে দেখা যায়নি তাঁকে। শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে নেয়।
জন্মদিন বিতর্ক ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত
খালেদা জিয়ার জন্মদিন ঘিরে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো বছর তিনি কেক কেটেছেন, আবার কোনো কোনো বছর দেশের পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে তা থেকে বিরত থেকেছেন। কারাবাসের পর তিনি আর প্রকাশ্যে জন্মদিন উদযাপন করেননি।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনীতিক নন, তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি বড় অধ্যায়। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি বহু সংকট মোকাবিলা করেছে। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন আপসহীন নেত্রী, আর সমালোচকদের কাছে ছিলেন শক্ত অবস্থানের প্রতীক।
তাঁর জীবন ছিল উত্থান-পতনে ভরা। কখনো ক্ষমতায়, কখনো বিরোধী দলে, আবার কখনো কারাগারে—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসে আলাদা করে জায়গা করে নিয়েছে।


