বুধবার, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬
22.7 C
Jessore
More

    খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন: ক্ষমতা, সংগ্রাম ও বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া এমন এক নাম, যাকে ঘিরে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আবর্তিত হয়েছে ক্ষমতা, আন্দোলন, বিতর্ক ও প্রতিরোধের গল্প। তিনি শুধু বিএনপির চেয়ারপারসন নন, ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং তিনবার রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত এক প্রভাবশালী নেত্রী। তার রাজনৈতিক জীবন মানেই উত্থান-পতন, কারাবাস, আন্দোলন, ব্যক্তিগত শোক আর কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলার ইতিহাস।

    খালেদা জিয়ার জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

    ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। জন্মের সময় তার নাম ছিল খালেদা খানম, ডাকনাম পুতুল। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। পারিবারিক শিকড় বাংলাদেশের ফেনী জেলায় হলেও দেশভাগের পর তার পরিবার তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যায়।

    জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহ ও জীবনের মোড়

    ১৯৬০ সালের আগস্টে দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনার সময় তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এই বিয়ের পর থেকেই তার জীবনের গতিপথ বদলে যায়। নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘জিয়া’, যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপ নেয়।

    রাজনীতিতে পদার্পণ ও প্রথম বক্তব্য

    ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়ার জীবনে আসে গভীর শোক। সেই শোকই একসময় তাকে রাজনীতির ময়দানে টেনে আনে। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে যোগ দেন। একই বছরের ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে তিনি প্রথম রাজনৈতিক বক্তব্য দেন।

    আরও পড়ুন :  মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি: তীব্র শীতে কাঁপছে বাংলাদেশ, ১০ জেলায় শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব

    বিএনপির নেতৃত্বে উত্থান

    রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। ১৯৮৩ সালের মার্চে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সালের আগস্টে তিনি দলের চেয়ারপারসন হন। এরপর টানা ৪১ বছর তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে থেকে দল পরিচালনা করেন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল।

    এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও আপসহীন নেতৃত্ব

    এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে খালেদা জিয়া নিজেকে আপসহীন নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে তিনি নির্বাচন বর্জন করেন। এই অবস্থানের কারণে তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার হতে হয়, তবে আন্দোলন থেকে তিনি কখনো সরে যাননি।

    প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিষেক

    ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তার প্রথম মেয়াদে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

    ১৯৯৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচন ও পরাজয়

    ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি জয় পেলেও নির্বাচনটি ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। বিরোধী আন্দোলনের মুখে সরকার টিকতে পারেনি। পরে একই বছরের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হয় এবং বিরোধী দলে বসে।

    আরও পড়ুন :  ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশে 'সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জে' ভারত

    চারদলীয় জোট ও ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন

    ১৯৯৯ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয় জোট গঠিত হয়। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচনে এই জোট জয়ী হয় এবং খালেদা জিয়া তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়কালে তার সরকার আইনশৃঙ্খলা, সন্ত্রাস দমন ও অর্থনৈতিক সংস্কারের নানা উদ্যোগ নেয়।

    অপারেশন ক্লিন হার্ট ও র‍্যাব গঠন

    ২০০২ সালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ শুরু হয়, যা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে র‍্যাব গঠন করা হয়। এই দুটি উদ্যোগই প্রশংসা ও সমালোচনা—দুটোরই মুখে পড়ে।

    ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকট ও ক্ষমতা হস্তান্তর

    তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে রাজনৈতিক সংকট চরমে পৌঁছালে ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। এর পরবর্তী সময় দেশের রাজনীতিতে অস্থিরতা বাড়তে থাকে।

    গ্রেপ্তার, কারাবাস ও কঠিন সময়

    ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন। প্রায় এক বছর কারাবাসের পর ২০০৮ সালে তিনি জামিনে মুক্তি পান। এই সময় তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোও কারাবন্দি ছিলেন।

    ব্যক্তিগত শোক: কোকোর মৃত্যু

    ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু খালেদা জিয়ার জীবনে গভীর আঘাত হানে। সন্তানের মরদেহ দেখে তার কান্নার দৃশ্য দেশের মানুষকে আবেগাপ্লুত করে।

    আরও পড়ুন :  ছাত্রদল ও এনসিপির নির্বাচনী বার্তা ও ২৪ দফা ইশতেহার: ঢাকায় দুই রাজনৈতিক সমাবেশে নতুন যুগের বার্তা

    নির্বাচনী আন্দোলন ও কারাবাস

    ২০১৮ সালে দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে তিনি কারাগারে যান। একই বছরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপি ফলাফল বাতিলের দাবি তোলে। ২০২০ সালে করোনার প্রেক্ষাপটে তিনি শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান।

    শারীরিক অসুস্থতা ও চিকিৎসা

    বিভিন্ন সময় তিনি কিডনি, লিভার ও হৃদরোগসহ নানা জটিলতায় ভুগেছেন। ২০২৪ সালে তার হৃদপিণ্ডে স্থায়ী পেসমেকার বসানো হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি একাধিকবার বিদেশে যান।

    মুক্তি ও জীবনের শেষ অধ্যায়

    ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি মুক্তি পান। তবে শারীরিক অবস্থার অবনতি তাকে দীর্ঘ সময় হাসপাতালেই রাখে। অবশেষে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৬টায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

    উপসংহার

    খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন মানেই বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় অধ্যায়। কেউ তাকে ভালোবাসে, কেউ সমালোচনা করে, কিন্তু তার প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি সংকটের মধ্যেও রাজনীতির ময়দান ছাড়েননি। তার জীবনগাথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রাজনীতি, নেতৃত্ব ও সংগ্রামের এক শক্তিশালী দলিল হয়ে থাকবে।

    লেটেস্ট আপডেট

    যুক্তরাজ্যের চাপে অ্যাপল–গুগলের বড় সিদ্ধান্ত! অ্যাপ স্টোরে আসছে নতুন নিয়ম

    যুক্তরাজ্যে প্রযুক্তি খাতে বড় একটি পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার।...

    টেক্সাসে ভয়াবহ পারিবারিক দ্বন্দ্ব: রাজনৈতিক তর্কের পর মেয়েকে গুলি করলেন বাবা

    পরিবারের মধ্যে তর্ক বা মতবিরোধ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।...

    ভোটের হারেই নির্ধারিত হবে ক্ষমতার সমীকরণ: বিএনপি বনাম জামায়াতের রাজনৈতিক লড়াই

    বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির মাঠ এখন...

    এক কাপ গোলাপ চায়ে প্রেমের সকাল: ভ্যালেন্টাইন ডে-তে বিশেষ রোজ টি রেসিপি

    এক কাপ চায়ে যদি ভালোবাসা ঢেলে দেওয়া যেত, তাহলে...

    সোশাল মিডিয়ায় ডিপফেক আর চলবে না: ৩ ঘণ্টার নিয়মে কড়া বার্তা সরকারের

    ডিপফেক ভিডিও, ভুয়ো ছবি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বিভ্রান্তিকর...

    বাছাই সংবাদ

    সোশাল মিডিয়ায় ডিপফেক আর চলবে না: ৩ ঘণ্টার নিয়মে কড়া বার্তা সরকারের

    ডিপফেক ভিডিও, ভুয়ো ছবি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বিভ্রান্তিকর...

    যশোরের ছয় আসনে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ছক, ৮২৪ ভোটকেন্দ্রেই সিসি ক্যামেরা স্থাপন

    আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে...

    ভোটের দিন নিরাপত্তা নিয়ে বড় বার্তা! ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ও পুলিশের প্রস্তুতি জানালেন ডিআইজি

    এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশ শটগানে শুধুমাত্র রাবার বুলেট...
    00:01:45

    নড়াইলে প্রেস ব্রিফিং: নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তায় পুলিশের বিশেষ প্রস্তুতি জানালেন ডিআইজি

    আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ ঘিরে নড়াইলসহ...

    তীব্র আপত্তির পর সিদ্ধান্ত বদল! ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিয়ে নতুন ঘোষণা ইসির

    নানা সমালোচনা ও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের আপত্তির পর ভোটকেন্দ্রে...

    যশোরের তরুণদের জন্য বড় ঘোষণা: মেধা ও যোগ্যতাই হবে চাকরির একমাত্র শর্ত

    যশোর-৩ (সদর) আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী অনিন্দ্য...

    গোয়ালদাহ বাজারে রাতের অভিযান! বিপুল ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২

    যশোরে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ দুই মাদক কারবারিকে...

    অভয়নগরে যৌথবাহিনীর অভিযান, ঘর থেকে মিলল পেট্রোল বোমা ও দেশীয় অস্ত্র!

    যশোরের অভয়নগরে যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে দেশীয় অস্ত্র, অ্যামুনেশন, চাইনিজ...

    এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

    জনপ্রিয় ক্যাটাগরি

    Translate »