রিফাত-বিন-ত্বহা ।। যশোরে শীত যেন আর সহনীয় পর্যায়ে নেই। কয়েক দিনের ব্যবধানে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ রূপ নিয়েছে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহে। উত্তরের হিমেল বাতাস, ঘন কুয়াশা আর সূর্যের অনুপস্থিতিতে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা এখন নিত্যসঙ্গী। বুধবার যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি শীতে এই অঞ্চলের জন্য বেশ উদ্বেগজনক।
যশোরে শীতের তীব্রতা বাড়ছে
যশোর বিমান বাহিনীর আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, পৌষ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই যশোরাঞ্চলে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে যায়। তখন শুরু হয়েছিল মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শীত আরও তীব্র হয়েছে। শনিবার ২৭ ডিসেম্বর যশোরে তাপমাত্রা নেমে আসে ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা সেদিন ছিল দেশের সর্বনিম্ন।
এর আগে শুক্রবারও দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল যশোরে, তখন পারদ ছিল ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। পরবর্তী কয়েক দিন তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও শীত কমেনি। বরং সূর্যের দেখা না পাওয়া, ঘন কুয়াশা আর উত্তরের বাতাস একসঙ্গে শীতের প্রকোপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ও যশোরের অবস্থান
বুধবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় গোপালগঞ্জে, ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তার খুব কাছাকাছি অবস্থানে ছিল যশোর। আবহাওয়া অফিস বলছে, যশোরে বর্তমানে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি আরও কিছুদিন এমনই থাকতে পারে।
গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে যশোরে কুয়াশা আর ঠান্ডা বাতাসের দাপটে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকছে চারপাশ। সূর্য উঠলেও তার তাপ অনুভূত হচ্ছে না।
শৈত্যপ্রবাহ কী এবং যশোরে কোন পর্যায় চলছে
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী,
৮ দশমিক ১ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।
৬ দশমিক ১ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে সেটি মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ।
৪ দশমিক ১ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ।
আর তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রির নিচে নামলে তাকে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়।
এই হিসাবে যশোরাঞ্চলের ওপর দিয়ে বর্তমানে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষ, শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।
শীতে বিপর্যস্ত স্বাভাবিক জীবনযাত্রা
হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় অনেকেই ঘর থেকে বের হতে চাইছেন না। যারা বের হচ্ছেন, তাদের গায়ে মোটা জ্যাকেট, সোয়েটার, মাফলার আর শীতের টুপি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গরম পোশাকেই চলাফেরা করছেন মানুষ।
শহরের রাস্তাঘাটে লোকজনের সংখ্যা কমে গেছে। দোকানপাটে আগের মতো ভিড় নেই। বিশেষ করে সকালবেলা শীতের কারণে কাজকর্ম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে।
শ্রমজীবী মানুষের কষ্টের দিন
তবে শৈত্যপ্রবাহ থাকলেও শ্রমজীবী মানুষের ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। যশোর শহরের লালদীঘি পাড় এলাকায় প্রতিদিন ৩ থেকে ৪শ’ মানুষ কাজের আশায় জড়ো হন। কিন্তু প্রচণ্ড শীতের কারণে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে।
অনেকেই সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বসে থেকেও কাজ পাচ্ছেন না। কেউ কেউ হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। আবার কেউ পেটের দায়ে ঠান্ডা উপেক্ষা করে কাজের আশায় অপেক্ষা করছেন।
খড়কি এলাকার নির্মাণ শ্রমিক রুহুল আমিন বলেন, শীতের মধ্যে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা খুব কষ্টের। কিন্তু কাজ না করলে তো সংসার চলবে না। কাজের আশায় এসে বসে থাকলেও বেশিরভাগ দিনই কাজ মিলছে না।
রায়পাড়া এলাকার শ্রমজীবী শহিদুল হোসেন বলেন, রাজমিস্ত্রির জোগাল হিসেবে কাজ করি। প্রচণ্ড শীতে শরীর অবশ হয়ে আসে। তারপরও কাজের আশায় ঘর থেকে বের হয়েছি। জানি না আজ কাজ পাবো কিনা।
রিকশাচালকদের আয় কমেছে
শীতের কারণে শহরে মানুষের চলাচল কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন রিকশাচালকরা। উপশহর এলাকার রিকশাচালক আলী হোসেন বলেন, এই শীতে মানুষ বাইরে বের হচ্ছে খুব কম। যাত্রী নেই বললেই চলে। আয় কমে গেছে, সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
শীতে নাকাল প্রাণিকূলও
গায়ে কাঁপন ধরানো এই শীতে শুধু মানুষ নয়, প্রাণিকূলও বিপাকে পড়েছে। রাস্তায় দেখা যাচ্ছে কুকুর, বিড়াল আর পাখিরা ঠান্ডায় জড়োসড়ো হয়ে আছে। অনেক পাখি গাছের ডালে বসে পালক ফুলিয়ে ঠান্ডা সামলানোর চেষ্টা করছে।
গ্রামাঞ্চলে গবাদিপশুর মালিকরাও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। শীত থেকে রক্ষা করতে খড়, বস্তা ও মোটা কাপড় দিয়ে পশুগুলো ঢেকে রাখা হচ্ছে।
সামনে কী হতে পারে
আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আপাতত শীতের এই পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। তাপমাত্রা খুব দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে যশোরবাসীকে আরও কিছুদিন এই মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের সঙ্গে মানিয়ে চলতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি শীতজনিত রোগ থেকে বাঁচতে গরম কাপড় ব্যবহার এবং প্রয়োজন ছাড়া ভোরে বাইরে না যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে যশোরে এখন শীত মানেই কষ্ট, মানিয়ে নেওয়া আর প্রতিদিনের সংগ্রাম।


