ভাবুন তো, যে প্রাণীটিকে সবাই প্রায় চিরতরে হারিয়ে গেছে বলে ধরে নিয়েছিল, সে হঠাৎ একদিন ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা দিল। ঠিক এমনই অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গলে। প্রায় তিন দশক ধরে যার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি, সেই অতি বিরল প্রজাতির বেড়াল ফের দেখা দিয়েছে। ১৯৯৫ সালের পর এই প্রথম দেখা মিলল রহস্যময় ‘ফ্ল্যাট হেডেড ক্যাট’-এর। এই খবরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন পরিবেশবিদ ও বন্যপ্রাণ গবেষকেরা।
৩০ বছর আগে শেষ দেখা, তারপর নিখোঁজ
১৯৯৫ সালে শেষবারের মতো এই বিশেষ প্রজাতির বেড়ালের দেখা পাওয়া গিয়েছিল। তারপর থেকে বহু বছর ধরে নানা ভাবে নজরদারি চালানো হয়। বন দফতর, গবেষক দল, পরিবেশবিদ—সকলেই চেষ্টা করেছিলেন এর অস্তিত্বের প্রমাণ খুঁজে বের করতে। কিন্তু বছরের পর বছর কেটে গেলেও কোনও চিহ্ন মেলেনি।
ধীরে ধীরে ধারণা তৈরি হয়, এই বেড়ালটি হয়তো পৃথিবী থেকেই হারিয়ে গেছে। অনেক বিরল প্রজাতির মতোই হয়তো মানুষের অজান্তেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। সেই আশঙ্কাই একসময় বাস্তব বলে মেনে নিয়েছিলেন অনেকে।
গোপন ক্যামেরাতেই ধরা পড়ল চমক
জঙ্গলের ভেতরে বন্যপ্রাণীদের গতিবিধি বুঝতে বন দফতর সাধারণত লুকোনো ক্যামেরা ব্যবহার করে। এই ক্যামেরাগুলি দিন-রাত নিরবচ্ছিন্নভাবে ছবি তোলে। মানুষের চোখে না ধরা পড়া বহু প্রাণী ধরা পড়ে এই ক্যামেরায়।
ঠিক এমনই একটি ক্যামেরাতেই ধরা পড়েছে সেই বহুদিন হারিয়ে যাওয়া বেড়াল। রাতের অন্ধকারে, নিঃশব্দে চলাফেরা করা প্রাণীটির ছবি দেখে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি গবেষকেরা। পরে বিস্তারিত বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি সেই হারিয়ে যাওয়া ফ্ল্যাট হেডেড ক্যাটই।
ফ্ল্যাট হেডেড ক্যাট কী ধরনের বেড়াল?
এই বেড়ালটির নাম শুনলেই বোঝা যায়, এর মাথার গঠনই সবচেয়ে আলাদা। মাথা তুলনামূলকভাবে চ্যাপ্টা। চেহারায় একেবারেই সাধারণ বেড়ালের মতো নয়। একটু বেজির মতো, আবার কিছুটা শেয়ালের ছাপও দেখা যায়।
আকারে ছোট হলেও এরা খুবই চটপটে। চোখ, মুখ আর শরীরের গঠন অন্য বেড়ালদের থেকে আলাদা হওয়ায় এক নজরেই চেনা যায়। এই কারণেই প্রাণিবিদদের কাছে এই প্রজাতি বরাবরই কৌতূহলের বিষয় ছিল।
কোথায় দেখা যায় এই বিরল বেড়াল?
ফ্ল্যাট হেডেড ক্যাট মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু জঙ্গলে পাওয়া যেত। বিশেষ করে থাইল্যান্ডের বনাঞ্চলেই এদের উপস্থিতির কথা জানা ছিল। জলাভূমি, নদীর ধারে কিংবা ঘন অরণ্যের নির্জন অংশে এরা থাকতে পছন্দ করে।
কিন্তু মানুষের বসতি বৃদ্ধি, বন উজাড় আর পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে এদের আবাসস্থল ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ফলে সংখ্যাও কমে যায় দ্রুত।
কেন এতদিন দেখা যায়নি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বেড়ালদের দেখা না পাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, এদের সংখ্যা অত্যন্ত কম। দ্বিতীয়ত, এরা একবারে মাত্র একটি শাবক জন্ম দেয়। ফলে প্রজাতির সংখ্যা বাড়ার গতি খুবই ধীর।
আরও একটি বড় কারণ হল এদের স্বভাব। এই বেড়ালরা দিনের বেলা খুব একটা বাইরে বেরোয় না। মূলত রাতেই এরা সক্রিয় থাকে। গভীর রাতে নিঃশব্দে চলাফেরা করে বলে মানুষের চোখে পড়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। তাই এত বছর ধরে এরা চোখের আড়ালেই ছিল।
মা বেড়ালের যত্ন আর একমাত্র শাবক
ফ্ল্যাট হেডেড ক্যাটের আরেকটি বিশেষ দিক হল এদের প্রজনন প্রক্রিয়া। অন্যান্য অনেক বেড়াল যেখানে একসঙ্গে একাধিক শাবক জন্ম দেয়, সেখানে এই প্রজাতির মা বেড়াল মাত্র একটি শাবকই প্রসব করে।
সেই একমাত্র শাবককেই সে অত্যন্ত যত্নে বড় করে তোলে। ফলে প্রজাতির বিস্তার খুব ধীরে হয়। কোনও কারণে যদি সেই শাবক বাঁচতে না পারে, তাহলে পুরো বংশটাই আরও সংকটের মুখে পড়ে।
পরিবেশবিদদের স্বস্তি ও নতুন আশার আলো
৩০ বছর পর এই বেড়ালটির দেখা পাওয়া মানে শুধু একটি প্রাণীর ছবি ধরা পড়া নয়। এর মানে, প্রজাতিটি এখনও বেঁচে আছে। সংখ্যায় খুব কম হলেও তারা হারিয়ে যায়নি—এই তথ্যটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তির।
পরিবেশবিদরা মনে করছেন, এখনই যদি সঠিক সংরক্ষণ পরিকল্পনা নেওয়া যায়, তাহলে এই বিরল প্রজাতিকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। তাদের আবাসস্থল রক্ষা করা, মানব হস্তক্ষেপ কমানো এবং নিয়মিত নজরদারি চালানো এখন সবচেয়ে জরুরি।
আগে যাদের বিলুপ্ত ধরা হয়েছিল
এই ঘটনার আগে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, ফ্ল্যাট হেডেড ক্যাট আর কখনও দেখা যাবে না। আন্তর্জাতিক স্তরেও একে প্রায় বিলুপ্ত প্রজাতির তালিকায় ধরা হচ্ছিল। কিন্তু এই নতুন তথ্য সেই ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করল।
এর আগে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় এমন ঘটনা ঘটেছে, যেখানে হারিয়ে গেছে বলে মনে করা প্রাণী হঠাৎ ফিরে এসেছে। এই বেড়ালও সেই তালিকায় নতুন করে জায়গা করে নিল।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কী?
এখন গবেষকেরা চাইছেন, এই প্রজাতির ওপর আরও বিস্তারিত সমীক্ষা করতে। কতগুলি বেড়াল এখনও বেঁচে আছে, তারা কোথায় থাকে, কীভাবে জীবনযাপন করে—এই সব তথ্য জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এই তথ্যের ভিত্তিতেই নেওয়া হবে সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপ। না হলে আবারও তারা চোখের আড়ালে হারিয়ে যেতে পারে।
শেষ কথা
৩০ বছর পর হারিয়ে যাওয়া ফ্ল্যাট হেডেড ক্যাটের ফিরে আসা প্রকৃতির এক নীরব চমক। এটা মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি এখনও অনেক রহস্য লুকিয়ে রেখেছে। আমরা যাকে হারিয়ে গেছে বলে ধরে নিই, সে হয়তো নিঃশব্দে কোথাও টিকে আছে।
এই খবর শুধু বিজ্ঞানীদের নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও আশার বার্তা। কারণ, যতদিন প্রকৃতির প্রতি যত্ন নেওয়া হবে, ততদিন এমন বিস্ময় আমাদের সামনে ধরা দিতেই থাকবে।


