বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া—এই দুই নাম যেন দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সংঘাত আর ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রতীক। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া একে অপরের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু সেই কঠিন বৈরিতার মাঝেও ২০০৭ সালে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আজও রাজনীতির ইতিহাসে ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে আছে। সে সময় শেখ হাসিনার গ্রেপ্তারের পর তার মুক্তি চেয়ে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া নিজেই।
সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও অস্থির রাজনীতির পটভূমি
২০০৬ সালের শেষ ভাগ থেকে ২০০৭ সালের শুরু পর্যন্ত বাংলাদেশ এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষে কে হবেন পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে রাজপথে সহিংসতা, সংঘর্ষ এবং অচলাবস্থা তৈরি হয়। সেই প্রেক্ষাপটেই ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
নতুন সরকারের আমলে রাজনীতিতে সংস্কারের কথা জোরালোভাবে আলোচনায় আসে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই দলেই অভ্যন্তরীণ সংস্কার নিয়ে মতভেদ তৈরি হয়। ঠিক এই সময়েই আলোচনায় আসে বহুল আলোচিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’। এই ফর্মুলার মূল ধারণা ছিল—দেশের রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে সরিয়ে দিয়ে নতুন নেতৃত্ব সামনে আনা। ফলে দুই নেত্রীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশজুড়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়।
শেখ হাসিনার গ্রেপ্তার এবং জনমনে প্রতিক্রিয়া
এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ভোরে শেখ হাসিনাকে ধানমণ্ডির বাসভবন ‘সুধা সদন’ থেকে চাঁদাবাজির একটি মামলায় গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাকে সরাসরি আদালতে হাজির করা হয়। তবে আদালত প্রাঙ্গণে শেখ হাসিনাকে যে ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তা দ্রুতই দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ভিড়ের মধ্যে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে তার মর্যাদা রক্ষা হয়নি—এমন অভিযোগ ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে।
শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে খালেদা জিয়ার বিবৃতি
এই ঘটনার ঠিক দুই দিন পর, ১৮ জুলাই, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান স্বাক্ষরিত সেই বিবৃতিতে শেখ হাসিনার মুক্তির দাবি জানানো হয়। বিবৃতির শুরুতেই খালেদা জিয়া বলেন, শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার এবং আদালতে আনা-নেওয়ার সময় তার মর্যাদা রক্ষায় প্রশাসনের ব্যর্থতা তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, একজন দলের প্রধান, একজন জাতীয় নেতার কন্যা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং একজন প্রবীণ নারী হিসেবে শেখ হাসিনা যে ধরনের অশোভন ও অসম্মানজনক পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। খালেদা জিয়ার ভাষায়, এতে কেবল ব্যক্তি শেখ হাসিনাই নয়, বরং বিবেকবান নাগরিকদের অনুভূতিও আহত হয়েছে এবং দেশ-বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
রাজনৈতিক ভিন্নমত সত্ত্বেও মানবিক অবস্থান
বিবৃতিতে খালেদা জিয়া অকপটে স্বীকার করেন, শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে তার সরকার, দল এবং এমনকি ব্যক্তিগতভাবেও তার বিরুদ্ধে কঠোর ও অশালীন মন্তব্য করেছেন। তবুও একজন মানুষ হিসেবে শেখ হাসিনাকে এভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের শিকার হতে দেখে তিনি সমানভাবে কষ্ট পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, মানুষ হিসেবে কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। একটি সমস্যাক্লিষ্ট দেশে বড় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে। তবে রাজনৈতিক ব্যর্থতার পাশাপাশি সাফল্যকেও খাটো করে দেখা উচিত নয়—এমন মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক সহনশীলতার বার্তা দেন।
আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
খালেদা জিয়া তার বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলেন, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ইচ্ছাকৃতভাবে আইন ভঙ্গ করলে সবার বিরুদ্ধেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দেন। প্রথমত, অভিযুক্ত হলেই কেউ অপরাধী হয়ে যায় না। তাই অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্ব। দ্বিতীয়ত, সব অভিযুক্ত যেন সন্দেহাতীতভাবে ন্যায়বিচার পায় এবং মানবাধিকার পুরোপুরি বজায় থাকে—সেই নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
এই দুটি নীতির আলোকে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও সতর্ক দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানান তিনি।
গ্রেপ্তার নয়, মুক্ত রেখে বিচার প্রক্রিয়ার আহ্বান
বিবৃতির এক পর্যায়ে খালেদা জিয়া মত দেন, শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার না করে বা তার জামিন আবেদনে সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধিতা না করে মুক্ত অবস্থায় বিচার প্রক্রিয়া চালানোই ভালো হতো। তিনি আরও বলেন, যদি আইনসঙ্গতভাবে সম্ভব হয়, তবে শেখ হাসিনাকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া উচিত। এতে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সামাজিক উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেকটাই কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
জরুরি অবস্থা ও গণতন্ত্রের পথে ফেরার বার্তা
সেই সময় দেশে জারি থাকা জরুরি অবস্থা প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, জরুরি অবস্থা অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও যে পরিস্থিতির কারণে তা এসেছে, শান্তিপ্রিয় জনগণ সেই অশান্তি ও বিশৃঙ্খলার পুনরাবৃত্তি চায় না। তবে জরুরি অবস্থার দীর্ঘস্থায়িত্বও কোনো সুফল বয়ে আনবে না।
তার মতে, জাতীয় জীবনের এই সন্ধিক্ষণে টেকসই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়া জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন বিদ্বেষ ও বিভাজন পরিহার করে জাতীয় ঐক্য ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠা। সেই সময়কে তিনি একটি সুযোগ ও সম্ভাবনার মুহূর্ত হিসেবেও উল্লেখ করেন এবং সবাইকে প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও সংযমের পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানান।
পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
২০০৭ সালে শেখ হাসিনার গ্রেপ্তারের প্রায় দুই মাস পর, ৩ সেপ্টেম্বর, দুর্নীতির একটি মামলায় খালেদা জিয়াও গ্রেপ্তার হন। তখন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমান সংবাদমাধ্যমে আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, খালেদা জিয়া ন্যায়বিচার পাবেন।
সে সময় দুই নেত্রীকেই জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার বিশেষ কারাগারে রাখা হয়। অবশেষে ২০০৮ সালের ১১ জুন শেখ হাসিনা এবং একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া মুক্তি পান। এরপর ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করে। আর খালেদা জিয়া বিরোধী দলের আসনে বসেন।
ইতিহাসে স্মরণীয় এক মানবিক দৃষ্টান্ত
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সম্পর্ক মূলত সংঘাত আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্পেই সীমাবদ্ধ। তবে ২০০৭ সালে শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে খালেদা জিয়ার দেওয়া বিবৃতি প্রমাণ করে, রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং মর্যাদার প্রশ্নে ভিন্ন এক দৃষ্টান্তও তৈরি হতে পারে। এই ঘটনা আজও মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক মূল্যবোধই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে আলাদা করে জায়গা করে নেয়।


