২০২৬ সাল শুরু হতেই বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে এসেছে। বছরের প্রথম দিনেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এই বছরটা খেলাধুলার মানুষের জন্য আলাদা কিছু নিয়ে এসেছে। মাঠে মাঠে লড়াই, গ্যালারিতে উন্মাদনা আর পর্দায় চোখ না সরানোর মতো মুহূর্তে ভরে থাকবে পুরো বছর। একটার পর একটা আন্তর্জাতিক আসর চলবে। খেলোয়াড়, দর্শক, সংগঠক—সবার জন্যই ২০২৬ মানে ব্যস্ততা আর উত্তেজনার নাম।
২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল: ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আয়োজন
২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—এই তিন দেশ যৌথভাবে আয়োজন করতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ। এবার অংশ নেবে ৪৮টি দেশ। আগে কখনো এত বেশি দল একসঙ্গে বিশ্বকাপে খেলেনি। ফলে ম্যাচ বাড়বে, গল্প বাড়বে, আর উত্তেজনাও বাড়বে কয়েক গুণ।
১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে ২৪ দল নিয়ে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল। ৩২ বছর পর সেই দেশ আবার ফিরছে আরও বড় রূপে। নতুন ফরম্যাটের এই বিশ্বকাপ ফুটবলকে নিয়ে আগ্রহ এখন তুঙ্গে।
মেসি, রোনালদো আর বিদায়ের আবেগ
এই বিশ্বকাপ ঘিরে আবেগের জায়গাটা একটু বেশি। অনেকের কাছেই এটি হতে পারে লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ। একই কথা শোনা যাচ্ছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার কিংবা মোহাম্মদ সালাহকে নিয়েও। প্রিয় তারকাদের শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চে দেখার সুযোগ দর্শকদের আবেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
একদিকে অভিজ্ঞ তারকাদের বিদায়ের সুর, অন্যদিকে লামিন ইয়ামালদের মতো নতুন মুখের উত্থান—এই মিশ্রণই ২০২৬ বিশ্বকাপকে আলাদা করে তুলেছে। অনেকেই মনে করছেন, নরওয়ের আর্লিং হলান্ড হতে পারেন এবারের বিশ্বকাপের বড় পোস্টার বয়।
বিশ্বকাপের সময়সূচি ও দর্শক উন্মাদনা
ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হবে ১১ জুন, শেষ হবে ১৯ জুলাই। প্রায় দেড় মাসের এই টুর্নামেন্টের জন্য বিশ্বজুড়ে অপেক্ষা করছে কোটি কোটি মানুষ। টিকিটের চাহিদাই তার বড় প্রমাণ। মাত্র কয়েক ধাপেই টিকিটের আবেদন ছাড়িয়েছে আগের সব রেকর্ড। গত ১৫ দিনে প্রায় ১৫ কোটি দর্শক টিকিটের জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে।
এই সংখ্যাই বলে দেয়, বিশ্বকাপ ফুটবলের জনপ্রিয়তা কতটা বেড়েছে। আগের দুই বিশ্বকাপে টিকিট থাকলে ভিসা ছাড়াই প্রবেশের সুযোগ ছিল। এবারও একই ধরনের সুবিধা থাকবে কি না, সেটি নিয়েও আলোচনা চলছে।
বিশ্বকাপের আমেজে ভাসবে পুরো বছর
বিশ্বকাপ শেষ হলেও তার রেশ থাকবে অনেক দিন। মাঠের লড়াই শেষ হলেও আলোচনা, বিশ্লেষণ আর স্মৃতিচারণ চলবে বছর শেষ পর্যন্ত। আর এই আমেজ শেষ না হতেই শুরু হবে আরেকটি বড় আসরের প্রস্তুতি।
কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬: বাংলাদেশের চোখ পদকে
বিশ্বকাপের পরপরই নজর যাবে কমনওয়েলথ গেমসের দিকে। ২৩ জুলাই থেকে ২ আগস্ট স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত হবে এই গেমস। কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো অংশ নেয় এই আসরে। বাংলাদেশও নিয়মিত অংশগ্রহণ করে এবং কিছু ইভেন্টে ভালো ফলের আশা করে।
এই গেমস তরুণ ক্রীড়াবিদদের জন্য বড় মঞ্চ। অনেক খেলোয়াড় এখান থেকেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে গতি পায়।
এশিয়ান গেমস: অলিম্পিকের পথে বড় ধাপ
কমনওয়েলথ গেমস শেষ হওয়ার আগেই শুরু হবে এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতি। জাপানের নাগোয়া শহরের আইচিতে অনুষ্ঠিত হবে এশিয়ান গেমসের ২০তম আসর। এশিয়ার সবচেয়ে বড় এই ক্রীড়া আসরে বাংলাদেশও অংশ নেবে।
এশিয়ান গেমস শুধু পদকের জন্য নয়। এখানে ভালো করা খেলোয়াড়রাই ভবিষ্যতে অলিম্পিক গেমসের প্রস্তুতি নেয়। তাই এই আসরের গুরুত্ব অন্য যেকোনো গেমসের চেয়ে কম নয়।
ক্রিকেট বিশ্বে ব্যস্ত সময়
২০২৬ সাল ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্যও ভরপুর। ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ মার্চ ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত হবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেট। বাংলাদেশ দল এই আসরে খেলবে। অনেকের স্বপ্ন পূরণ হবে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে খেলা দেখার।
এছাড়া অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপ হবে জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ায়। ১৫ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে এই টুর্নামেন্ট। জুন মাসে ইংল্যান্ডের ওয়েলসে অনুষ্ঠিত হবে আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ।
অলিম্পিক, হকি আর অন্যান্য বিশ্ব আসর
৬ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি ইতালির মিলানে অনুষ্ঠিত হবে শীতকালীন অলিম্পিক। আগস্টে বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস যৌথভাবে আয়োজন করবে ছেলে ও মেয়েদের হকি বিশ্বকাপ।
এর পাশাপাশি টেনিসপ্রেমীরা উপভোগ করবেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, ফ্রেঞ্চ ওপেন, উইম্বলডন, ইউএস ওপেন ও কানাডিয়ান ওপেনের মতো ঐতিহ্যবাহী টুর্নামেন্ট।
আগের বছরের অভিজ্ঞতা আর নতুন প্রত্যাশা
২০২৫ সাল ক্রীড়াঙ্গনের পাশাপাশি বিশ্ব রাজনীতিতেও ছিল অস্থির। যুদ্ধ, সহিংসতা আর মানবিক সংকটে বিশ্ব বিবেক নড়ে উঠেছিল। সেই অন্ধকার সময় পেছনে ফেলে মানুষ এখন চাইছে আনন্দ, খেলাধুলা আর ইতিবাচক গল্প।
২০২৬ যেন হয় শান্তির বছর। যেন মাঠের লড়াই ছাড়া আর কোনো যুদ্ধ না থাকে। বোমার শব্দ নয়, শোনা যায় গ্যালারির উল্লাস।
নতুন বছরে নতুন আশা
ক্যালেন্ডার বলছে, ২০২৬ হবে খেলাধুলার বছর। মাঠে ঘাম ঝরাবে খেলোয়াড়রা, আর আমরা উপভোগ করব তাদের সেরা লড়াই। নতুন বছর মানে নতুন স্বপ্ন, নতুন গল্প আর নতুন ইতিহাস।
খেলার যুদ্ধই হোক আমাদের একমাত্র যুদ্ধ।
সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। হ্যাপি নিউ ইয়ার।


