বছরের শেষ দিকে যেভাবে জাঁকিয়ে শীত পড়েছিল, নতুন বছর শুরু হতেই যেন তার রেশ কমে গেল। কয়েক দিন আগেও কনকনে ঠান্ডায় কাঁপছিল দক্ষিণবঙ্গ। আর এখন? সকালে ঠান্ডা থাকলেও দিনের বেলায় সেই অনুভূতি অনেকটাই হালকা। অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি শীত বিদায় নিচ্ছে? নাকি আবার ফিরবে সেই কনকনে ঠান্ডা?
এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে হাওয়া অফিস। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শীত এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। বরং খুব শিগগিরই আবার ঠান্ডার দাপট বাড়তে চলেছে। সঙ্গে রয়েছে বৃষ্টি আর কুয়াশার খবর।
নতুন বছরে কমল শীত, কেন এমন হল?
টানা প্রায় এক সপ্তাহ প্রবল ঠান্ডার পর হঠাৎ করেই তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে যায়। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গে এই পরিবর্তন বেশি চোখে পড়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এর মূল কারণ হল জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি।
সহজ করে বললে, বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে গেলে শীতের তীব্রতা কিছুটা কম অনুভূত হয়। ঠিক সেটাই হয়েছে দক্ষিণবঙ্গে। ফলে সকালের ঠান্ডা থাকলেও আগের মতো সারাদিন কাঁপুনি নেই।
তবে অনেকেই ভেবেছিলেন, বুঝি এটাই শীতের শেষ অধ্যায়। কিন্তু হাওয়া অফিস বলছে, এই ধারণা একেবারেই ঠিক নয়।
কবে থেকে ফিরছে জাঁকিয়ে শীত?
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোমবার থেকেই আবার তাপমাত্রা কমতে শুরু করবে। ধাপে ধাপে পারদ নামবে। আগামী তিন দিনে তাপমাত্রা ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমতে পারে।
এই ঠান্ডা শুধু একদিনের জন্য নয়। কমপক্ষে তিন দিন ধরে এই শীতের দাপট বজায় থাকবে। তার মানে, আগামী সপ্তাহের শুরু থেকেই দক্ষিণবঙ্গের মানুষ আবার শীতের কামড়ে পড়তে চলেছেন।
কলকাতাও এর বাইরে নয়। শহরবাসীকেও আবার বের করতে হতে পারে মোটা সোয়েটার আর জ্যাকেট।
মকরসংক্রান্তি পর্যন্ত শীত, তারপর কী?
আমাদের মধ্যে একটা প্রচলিত ধারণা আছে। মকরসংক্রান্তি পর্যন্তই নাকি শীত সবচেয়ে বেশি থাকে। তারপর মাঘ মাসে ধীরে ধীরে ঠান্ডা কমে। ফেব্রুয়ারিতে এসে শীত প্রায় বিদায় নেয়।
এবারও কি ঠিক তেমনটাই হবে? এই মুহূর্তে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে হাওয়া অফিসের ইঙ্গিত স্পষ্ট। সামনের সপ্তাহের শুরুতে শীত আবার জাঁকিয়ে বসবে।
এরপর ধীরে ধীরে ঠান্ডার তীব্রতা কমবে কি না, তা নির্ভর করবে পরবর্তী আবহাওয়ার অবস্থার উপর।
দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টি নেই, তবে কুয়াশার দাপট থাকবে
দক্ষিণবঙ্গের জন্য আপাতত বৃষ্টির কোনও পূর্বাভাস নেই। এতে অনেকেই স্বস্তি পাচ্ছেন। তবে অন্য একটা সমস্যা থাকছে। তা হল ঘন কুয়াশা।
সকালে এবং গভীর রাতে কুয়াশার প্রভাব বাড়তে পারে। এর ফলে দৃশ্যমানতা কমবে। যাঁরা সকালে অফিস বা স্কুলে বের হন, তাঁদের একটু সাবধানে চলাচল করতে হবে।
বিশেষ করে হাইওয়ে এবং খোলা রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছে আবহাওয়া দফতর।
উত্তরবঙ্গে শীতের সঙ্গে বৃষ্টি
দক্ষিণবঙ্গে যখন বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই, তখন উত্তরবঙ্গে ছবিটা একটু আলাদা। হাওয়া অফিস জানিয়েছে, উত্তরবঙ্গের তিনটি জেলায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
এই জেলাগুলি হল দার্জিলিং, কালিম্পং এবং জলপাইগুড়ি। এখানে শীতের পাশাপাশি বৃষ্টি হতে পারে। সঙ্গে থাকবে ঘন কুয়াশাও।
উত্তরবঙ্গের এই আবহাওয়া বদল সাধারণ মানুষের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ খবর।
দার্জিলিংয়ে তুষারপাতের সম্ভাবনা
এই পূর্বাভাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি হল দার্জিলিং। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, দার্জিলিংয়ে বৃষ্টির সঙ্গে তুষারপাতের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
শীতের এই সময়ে যাঁরা দার্জিলিং বেড়াতে গেছেন বা যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে দারুণ খবর। তুষারপাত দেখা মানে পাহাড়ের সৌন্দর্য আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া।
তবে তুষারপাত হলে রাস্তাঘাটে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই পর্যটকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কেন আবার শীত বাড়ছে?
এই সময়টায় উত্তর দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে আসার প্রবণতা থাকে। একে বলা হয় উত্তর-পশ্চিমী শুষ্ক হাওয়া। এই হাওয়া সক্রিয় হলেই তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়।
হাওয়া অফিসের মতে, সোমবার থেকে এই ঠান্ডা হাওয়ার প্রভাব বাড়বে। তার ফলেই আবার পারদ পতন ঘটবে।
এই ধরনের শীত সাধারণত কয়েক দিন স্থায়ী হয়। তারপর ধীরে ধীরে আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটে।
দৈনন্দিন জীবনে কী প্রভাব পড়বে?
শীত বাড়লে তার প্রভাব পড়ে দৈনন্দিন জীবনে। সকালের কুয়াশায় ট্রেন ও বিমানের সময়সূচিতে দেরি হতে পারে। রাস্তায় দৃশ্যমানতা কমে গেলে যান চলাচল ধীর হয়।
ঠান্ডার কারণে বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের বিশেষ যত্ন নেওয়া দরকার। শীতজনিত অসুখ যেমন সর্দি-কাশি, জ্বরের প্রকোপ বাড়তে পারে।
এই সময়ে গরম জামাকাপড় ব্যবহার করা এবং প্রয়োজন ছাড়া ভোর বা গভীর রাতে বাইরে না বেরোনোই ভাল।
কৃষকদের জন্য কী বার্তা?
আবহাওয়ার এই পরিবর্তন কৃষকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। শীত বাড়লে কিছু ফসল উপকৃত হয়, আবার কুয়াশা বেশি হলে ক্ষতির সম্ভাবনাও থাকে।
বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে বৃষ্টির সম্ভাবনার কারণে চা বাগান ও সবজি চাষিদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। হঠাৎ বৃষ্টি ও ঠান্ডা একসঙ্গে পড়লে ফসলের উপর প্রভাব পড়তে পারে।
শীতপ্রেমীদের জন্য সুখবর
যাঁরা শীত ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য এই খবর নিঃসন্দেহে সুখবর। আবার কয়েক দিন অন্তত কনকনে ঠান্ডা উপভোগ করা যাবে। সকালে গরম চা, রোদ পোহানো আর মোটা কম্বলের আরাম আবার ফিরে আসবে।
অন্যদিকে, যাঁরা ঠান্ডা সহ্য করতে পারেন না, তাঁদের একটু প্রস্তুত থাকতে হবে।
সারসংক্ষেপে কী বলছে হাওয়া অফিস
সংক্ষেপে বললে, শীত পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। নতুন বছরের শুরুতে কিছুটা কমলেও আবার ফিরছে ঠান্ডার দাপট। দক্ষিণবঙ্গে তাপমাত্রা কমবে, থাকবে কুয়াশা। উত্তরবঙ্গে শীতের সঙ্গে বৃষ্টি, আর দার্জিলিংয়ে তুষারপাতের সম্ভাবনাও রয়েছে।
অতএব, শীতের পোশাক এখনই তুলে রাখার সময় আসেনি। বরং আগামী কয়েক দিন আবার জাঁকিয়ে শীত উপভোগ করার জন্য প্রস্তুত থাকাই ভালো।


