ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে হঠাৎ করেই বিশ্ব রাজনীতিতে ঝড় উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ‘আটক’ করার খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই ঘোষণা করেছেন, মাদুরো দম্পতিকে যুক্তরাষ্ট্রে এনে আমেরিকান বিচারের মুখোমুখি করা হবে। প্রশ্ন একটাই—ট্রাম্প কেন এত বড় ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন?
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার পটভূমি
ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছে। তাদের অভিযোগ, ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার, অপরাধী চক্র পাঠানো এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে। এই অভিযোগকে সামনে রেখে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ এবং সামরিক তৎপরতা ধীরে ধীরে বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত তা সরাসরি সামরিক অভিযানে গড়ায়।
মার-এ-লাগোতে দেওয়া এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, “ভেনেজুয়েলায় শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার রদবদল না হওয়া পর্যন্ত আমরা দেশটির পরিচালনার দায়িত্ব নেব।” তাঁর এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয়, এটি শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও।
মাদুরো ‘আটক’ ও নিউ ইয়র্কে নেওয়ার ঘোষণা
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে মার্কিন বাহিনী আটক করে যুদ্ধজাহাজে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে তাঁদের বিরুদ্ধে আমেরিকান আইনে বিচার হবে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অভিযানে সেনাবাহিনীর অভিজাত ইউনিট ‘ডেল্টা ফোর্স’ অংশ নিয়েছে।
এই ঘোষণার পরই প্রশ্ন উঠেছে—একটি সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্টকে অন্য রাষ্ট্র কীভাবে আটক করতে পারে? আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বিষয়টি অত্যন্ত বিতর্কিত।
ট্রাম্পের দাবি: “আমরাই ভেনেজুয়েলা চালাবো”
ট্রাম্প আরও বলেন, আপাতত ভেনেজুয়েলা পরিচালনার জন্য লোকজন মনোনীত করা হচ্ছে। তিনি ইঙ্গিতে বোঝান, নিজে ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাময়িকভাবে এই দায়িত্বে থাকবেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, এটি সীমিত সময়ের জন্য হলেও সরাসরি হস্তক্ষেপ।
এমনকি তিনি হুমকি দেন, প্রয়োজনে দ্বিতীয় দফায় আরও বড় হামলা চালানো হবে। একই সঙ্গে জানান, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো শিগগিরই ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ করে অবকাঠামো মেরামত ও তেল উৎপাদন শুরু করবে।
অভিযানের সময় কী ঘটেছিল?
ভেনেজুয়েলার ভেতর থেকে পাওয়া ভিডিওতে রাজধানী কারাকাসে বড় বিস্ফোরণ, ধোঁয়া আর যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনা যায়। বাসিন্দারা জানান, একাধিক সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়। হেলিকপ্টার ও যুদ্ধবিমান একসঙ্গে আকাশে টহল দেয়।
ভেনেজুয়েলা সরকার নিশ্চিত করেছে, কারাকাসের পাশাপাশি মিরান্ডা, লা গুয়াইরা ও আরাগুয়া রাজ্যেও হামলা হয়েছে। তবে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেলসি রদ্রিগেজ তখনও দেশে ছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে জানান, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনো ক্ষমতায় আছে।
নিকোলাস মাদুরো কীভাবে ক্ষমতায় এলেন?
নিকোলাস মাদুরোর রাজনৈতিক উত্থান অনেকটা সিনেমার গল্পের মতো। একসময় তিনি ছিলেন বাসচালক ও শ্রমিক নেতা। পরে বামপন্থী নেতা হুগো শাভেজের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। শাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট হন।
দীর্ঘ ২৬ বছরে শাভেজ ও মাদুরোর শাসনে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রযন্ত্রের বড় অংশ ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, জাতীয় পরিষদ—সবখানেই তাদের প্রভাব দৃঢ় হয়।
২০২৪ সালের নির্বাচনে মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করা হলেও বিরোধীদের দাবি ছিল ভিন্ন। তাদের মতে, প্রকৃত বিজয়ী ছিলেন এডমুন্ডো গনসালেস, যিনি মারিয়া কোরিনা মাচাডোর প্রতিনিধিত্ব করছিলেন।
মারিয়া কোরিনা মাচাডো ও বিরোধী আন্দোলন
মারিয়া কোরিনা মাচাডো ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনীতির অন্যতম মুখ। নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতীক হয়ে ওঠেন। অক্টোবরে তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়, যা মাদুরো সরকারের জন্য বড় ধাক্কা ছিল।
ট্রাম্প অবশ্য মনে করেন, মাচাডোর পক্ষে দেশ পরিচালনা করা কঠিন। তাঁর মতে, দেশের ভেতরে তাঁর যথেষ্ট সমর্থন নেই।
ট্রাম্প কেন ভেনেজুয়েলাকে লক্ষ্য করলেন?
ট্রাম্প মাদুরোকে দোষারোপ করেন যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল সংখ্যক ভেনেজুয়েলান অভিবাসীর আগমনের জন্য। ২০১৩ সালের পর থেকে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছে বলে ধারণা। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, মাদুরো ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধীদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছেন, যদিও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি।
আরেকটি বড় কারণ হলো মাদক। ট্রাম্প ফেন্টানিল ও কোকেন প্রবাহ বন্ধ করাকে নিজের প্রশাসনের অগ্রাধিকার বানিয়েছেন। তিনি ভেনেজুয়েলার দুটি অপরাধী গোষ্ঠীকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
ভেনেজুয়েলা কি সত্যিই মাদক পাচারে বড় ভূমিকা রাখে?
মাদক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সীমিত। দেশটি মূলত একটি ট্রানজিট পয়েন্ট। কোকেনের প্রধান উৎপাদক কলম্বিয়া, আর ফেন্টানিল মূলত মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকে স্থলপথে।
মার্কিন ডিইএ-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টেও ভেনেজুয়েলাকে ফেন্টানিলের উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। তবু ট্রাম্প এই ইস্যুকে রাজনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করছেন।
সামরিক চাপ কীভাবে বাড়তে থাকে?
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসেই ট্রাম্প মাদুরোর ওপর পুরস্কারের অঙ্ক বাড়ান। এরপর ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরে একের পর এক নৌযানে হামলা শুরু হয়। এসব হামলায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে বলে জানা যায়।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমনকি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক প্রসিকিউটর এটিকে শান্তিকালে বেসামরিকদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক উপস্থিতি
যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানে প্রায় ১৫ হাজার সেনা, একাধিক বিমানবাহী রণতরী ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড।

এই বাহিনী শুধু মাদকবিরোধী অভিযান নয়, ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ কার্যকর করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ভেনেজুয়েলার তেল: আসল কারণ কি এখানেই?
ভেনেজুয়েলার হাতে বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেল মজুদ রয়েছে। তেল খাত দেশটির অর্থনীতির মেরুদণ্ড। মাদুরোর অভিযোগ, ট্রাম্প আসলে এই তেলসম্পদের দিকেই নজর রেখেছেন।
একবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, দখল করা তেলবাহী জাহাজের তেল “আমরাই রেখে দেব।” এই মন্তব্য সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেন, তেল দখলই তাদের মূল লক্ষ্য নয়। তবু বাস্তবতা হলো—নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি ভেঙে পড়েছে, আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ মানুষ।
শেষ কথা
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা ও মাদুরো ‘আটক’ হওয়ার দাবি শুধু একটি দেশের সংকট নয়। এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আইন ও নৈতিকতার বড় পরীক্ষা। ট্রাম্প এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে দেখালেও, অনেকের চোখে এটি শক্তির রাজনীতির নগ্ন উদাহরণ।
এই পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলাকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটাই নিশ্চিত—এই ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে।


