যশোরে আবারও নৃশংস সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধা এনাম সিদ্দিকীকে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রোববার সকালেই ঘটে যাওয়া এই হামলা শুধু একজন ব্যক্তিকে আহত করেনি, বরং স্থানীয় মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতার গভীর ছাপ ফেলেছে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, অতীতের আন্দোলন এবং আসন্ন নির্বাচন—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রোববার (৪ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে আটটার দিকে যশোর সদর উপজেলার এনায়েতপুর এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, এনাম সিদ্দিকী বাড়ির সামনে স্বাভাবিকভাবেই হাঁটাহাঁটি করছিলেন। ঠিক সেই সময় মুখ বাঁধা অবস্থায় দুইজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি হঠাৎ তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রথমে লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। এরপর একের পর এক তিনবার বুকে ছুরিকাঘাত করা হয়।
এনামের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এলে হামলাকারীরা দ্রুত পালিয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা এনামকে পরিবারের সদস্যরা উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন।
আহত এনাম সিদ্দিকী এনায়েতপুর এলাকার মৃত খন্দকার আমিনুল্লাহর ছেলে। তিনি কেবল একজন সাধারণ নাগরিক নন; তিনি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী এবং আহত যোদ্ধা। ওই বছরের ৪ আগস্ট উত্তরা এলাকায় আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে মাথায় আঘাত পান তিনি। দীর্ঘ চিকিৎসা ও কষ্টকর পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন এনাম।
এমন একজন মানুষ, যিনি আগেই রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার হয়েছেন, তাকে আবারও নির্মম হামলার মুখে পড়তে হলো—এটাই এলাকাবাসীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. বিচিত্র মল্লিক জানান, এনাম সিদ্দিকীর বুকে, ঘাড়ে এবং বাহুতে একাধিক স্থানে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। রক্তক্ষরণ বেশি হওয়ায় তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। বর্তমানে তাকে সার্জারি বিভাগে রেখে নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকদের মতে, ছুরিকাঘাতের ধরন ও আঘাতের গভীরতা দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, হামলাকারীদের উদ্দেশ্য ছিল প্রাণনাশ। সময়মতো হাসপাতালে আনা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।
এনামের স্বজনদের দাবি, এটি কোনো সাধারণ মারামারি নয়। পরিকল্পিতভাবেই তাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে এই হামলা চালানো হয়েছে। মুখ বাঁধা হামলাকারী, নির্দিষ্টভাবে মাথা ও বুকে আঘাত—সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি টার্গেটেড অ্যাটাক বলেই মনে করছেন তারা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, এনাম সম্প্রতি কোনো ব্যক্তিগত বিরোধে জড়াননি। তাই এই হামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
এই ঘটনার পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। যশোর সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনজারুল হক খোকন বলেন, আসন্ন নির্বাচনকে অস্থিতিশীল করতেই পরিকল্পিতভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যোদ্ধাদের টার্গেট করা হচ্ছে। তার দাবি, যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবেই এমন হামলা চালানো হচ্ছে।
তিনি দ্রুত হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের দাবি জানান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
যশোর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহম্মদ জানিয়েছেন, হামলার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।
তিনি বলেন, এটি একটি গুরুতর অপরাধ। দোষীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এখনো কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
এই ছুরিকাঘাতের ঘটনার পর এনায়েতপুর এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই বলছেন, দিনের আলোতে যদি এমন হামলা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? বিশেষ করে যারা কোনো সময় আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন বা রাজনৈতিকভাবে পরিচিত মুখ, তারা নিজেদের আরও ঝুঁকির মধ্যে মনে করছেন।
স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় নিয়মিত টহল জোরদার করতে হবে এবং দ্রুত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। না হলে এমন ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।


