ক্রিকেট কখনও আনন্দ দেয়, আবার কখনও এক ঝটকায় বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে আনে। মুস্তাফিজুর রহমানের গত কয়েক দিনের গল্পটা ঠিক তেমনই। একদিন তিনি ইতিহাস গড়ছেন, বিশ্ব ক্রিকেটে নিজের নাম আরও উজ্জ্বল করছেন। পরের দিনই সেই উচ্ছ্বাস ভেঙে চুরমার। কারণ, আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের জার্সিতে মাঠে নামার স্বপ্নটা মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল।
রংপুর রাইডার্সের হয়ে স্মরণীয় রাত
গত শুক্রবার বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে রংপুর রাইডার্সের হয়ে সিলেট টাইটান্সের বিরুদ্ধে খেলতে নেমেছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। ম্যাচটা তাঁর জন্য ছিল বিশেষ। কারণ, এই ম্যাচেই তিনি ছুঁয়ে ফেলেন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ৪০০ উইকেটের মাইলফলক।
চার ওভারে মাত্র ২৪ রান দিয়ে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেন বাঁহাতি এই পেসার। ম্যাচের আগে তাঁর উইকেট সংখ্যা ছিল ৩৯৯। সিলেটের ইনিংসে মেহদি হাসান মিরাজকে আউট করেই ইতিহাসে নিজের নাম তুলে ফেলেন মুস্তাফিজ।
সেই মুহূর্তে মাঠে যেমন উচ্ছ্বাস ছিল, তেমনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয়ে যায় অভিনন্দনের বন্যা।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অনন্য নজির মুস্তাফিজের
৪০০ উইকেট নেওয়া এমনিতেই বড় কৃতিত্ব। কিন্তু মুস্তাফিজ এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি গড়েছেন আরও বড় নজির। জোরে বোলার হিসেবে দ্রুততম ৪০০ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড এখন তাঁর দখলে।
মাত্র ৩১৫টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেই এই মাইলফলক স্পর্শ করেছেন তিনি। এতদিন এই রেকর্ড ছিল পাকিস্তানের ওয়াহাব রিয়াজের দখলে। ওয়াহাব ৩৩৫টি ম্যাচে ৪০০ উইকেট পূর্ণ করেছিলেন। অর্থাৎ, ২০ ম্যাচ কম খেলেই সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন মুস্তাফিজুর রহমান।
বিশ্ব ক্রিকেটে তিনি হলেন টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের ১১তম ক্রিকেটার, যিনি ৪০০ উইকেটের গণ্ডি পার করলেন।
রশিদ খানের পরেই মুস্তাফিজ
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সব মিলিয়ে সবচেয়ে দ্রুত ৪০০ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড রয়েছে আফগানিস্তানের রশিদ খানের। তিনি মাত্র ২৮৯ ম্যাচে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন।
সেই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে এখন মুস্তাফিজুর রহমান। আর তৃতীয় স্থানে রয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ইমরান তাহির, যিনি ৩২০ ম্যাচে ৪০০ উইকেট পূর্ণ করেছিলেন।
এত বড় নামগুলোর পাশে নিজের নাম দেখতে পাওয়াটা যে কোনও বোলারের জন্যই গর্বের। মুস্তাফিজও সেই আনন্দ লুকোননি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ইতিহাস গড়ার পর মুস্তাফিজুর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন। ভক্তদের ধন্যবাদ জানান। অনেকেই তখন ভাবছিলেন, সামনে আরও বড় মঞ্চে তাঁকে দেখা যাবে।
কারণ, ঠিক তার পরেই ছিল আইপিএল। কলকাতা নাইট রাইডার্স তাঁকে দলে নিয়েছে ৯ কোটি ২০ লাখ টাকার বড় অঙ্কে। সব মিলিয়ে মুস্তাফিজের সময়টা যে দারুণ যাচ্ছে, তা বলাই যায়।
কিন্তু ক্রিকেটের গল্প যে কত দ্রুত বদলে যায়, তা বোঝা গেল খুব তাড়াতাড়ি।
আনন্দের পরেই দুঃসংবাদ, আইপিএল থেকে বাদ মুস্তাফিজ
টি-টোয়েন্টিতে ৪০০ উইকেটের মাইলফলক ছোঁয়ার ঠিক পরের দিনই এল দুঃসংবাদ। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে মুস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স।
অর্থাৎ, নিলামে এত বড় দাম পেলেও এ বার আইপিএলে মাঠে নামা হচ্ছে না তাঁর। একদিন আগে যেখানে তিনি ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাচ্ছেন, ঠিক তার পরদিনই আইপিএলের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
এই খবর স্বাভাবিকভাবেই হতাশ করেছে ভক্তদের। কারণ, কেকেআরের জার্সিতে মুস্তাফিজকে দেখার অপেক্ষায় ছিলেন অনেকেই।
কেন বাদ পড়লেন কেকেআর থেকে?
আইপিএলে বিদেশি ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণে বোর্ডের অনুমতি বড় বিষয়। সূচি, আন্তর্জাতিক দায়িত্ব এবং বোর্ডের নির্দেশ—এই সবকিছুর উপর নির্ভর করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই পরিস্থিতিতেই শেষ পর্যন্ত কেকেআরের স্কোয়াডে জায়গা হয়নি মুস্তাফিজের। যদিও তাঁর পারফরম্যান্স বা ফর্ম নিয়ে কোনও প্রশ্ন ছিল না।
টি-টোয়েন্টিতে মুস্তাফিজের বর্তমান পরিসংখ্যান
এই মুহূর্তে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে মুস্তাফিজুর রহমানের উইকেট সংখ্যা ৪০২। প্রতিটা উইকেটের পিছনেই আছে বছরের পর বছর পরিশ্রম, চোট কাটিয়ে ফেরা আর নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার গল্প।
স্লোয়ার কাটার, ইয়র্কার আর চাপের মুখে ঠান্ডা মাথায় বল করার ক্ষমতার জন্যই তিনি আলাদা। তাই আইপিএল না খেললেও তাঁর কৃতিত্বের মূল্য কোনও ভাবেই কমে না।
শেষ কথা: উত্থান-পতনের মাঝেই মুস্তাফিজ
মুস্তাফিজুর রহমানের এই গল্পটা আসলে ক্রিকেট জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। একদিকে রেকর্ড, উচ্ছ্বাস আর ইতিহাস। অন্যদিকে হতাশা আর অপূর্ণ স্বপ্ন।
আজ আইপিএল নেই, কিন্তু সামনে আরও অনেক ম্যাচ, আরও অনেক মাইলফলক অপেক্ষা করছে। কারণ, ফিজ মানেই লড়াই। আর সেই লড়াইয়েই তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন, কেন তিনি বাংলাদেশের অন্যতম সেরা টি-টোয়েন্টি বোলার।


