বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল অধ্যায় যেন থমকে গেল। জাতীয় ঐক্য ও নির্ভরতার প্রতীক, দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও। এই মহীয়সী নেত্রীর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান জানাতে যবিপ্রবির পক্ষ থেকে গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি রোববার ৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে পালিত হয়।
শোক, শ্রদ্ধা আর স্মৃতিচারণায় ভরা এই আয়োজন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে এক আবেগঘন পরিবেশে রূপ দেয়।
যবিপ্রবিতে আনুষ্ঠানিক শোকসভা অনুষ্ঠিত
রোববার যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম একাডেমিক ভবনের অধ্যাপক মোহাম্মদ শরিফ হোসেন গ্যালারিতে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। শুরুতেই পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা হয়। এরপর জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন এবং দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালনের মাধ্যমে মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
শোকসভা শেষে তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। পুরো অনুষ্ঠানজুড়েই ছিল এক ধরনের নীরবতা, যেখানে কথা কম, অনুভূতি বেশি।
বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতিতে মর্যাদাপূর্ণ আয়োজন
এই শোকসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যবিপ্রবির সম্মানিত রিজেন্ট বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক নার্গিস বেগম। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আব্দুল মজিদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন যবিপ্রবির কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. হোসেন আল মামুন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে শোকসভাটি হয়ে ওঠে আরও অর্থবহ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবদান
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক নার্গিস বেগম মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতির এক আপসহীন ও মানবিক আলোকবর্তিকা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার কথা বলতে গেলেই আমরা স্মৃতিতে ফিরে যাই। তিনি ছিলেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এক সাহসী নেত্রী।
তিনি আরও বলেন, বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে দেশের গণতন্ত্র ছিল নড়বড়ে, অর্থনীতি ছিল দুর্বল এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো ছিল অগোছালো। তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশ নতুন করে ঘুরে দাঁড়ায়। উন্নয়ন, আত্মমর্যাদা আর স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন।
নারী শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রসারে তাঁর চিন্তাভাবনা ছিল সময়ের অনেক আগেই। যশোর অঞ্চলের উন্নয়নেও তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। বক্তব্যের শেষ অংশে সবাইকে মরহুমা নেত্রীর রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করার আহ্বান জানান অধ্যাপক নার্গিস বেগম।
উপাচার্যের বক্তব্যে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা
শোকসভায় সভাপতির বক্তব্যে যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আব্দুল মজিদ বলেন, মাতৃসম, মহীয়সী নারী এবং ঐক্য ও নির্ভরতার প্রতীক বেগম খালেদা জিয়াকে আমরা গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ঐক্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বেগম খালেদা জিয়া আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দৃঢ় অবস্থান তাঁকে ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তিনি চিরকাল মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।
অন্যান্য বক্তাদের স্মৃতিচারণা
শোকসভায় আরও বক্তব্য রাখেন ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. জিয়াউল আমিন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. ইঞ্জি. মো. ইমরান খান, অডিট শাখার সহকারী পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান, প্রক্টর দপ্তরের কর্মচারী মো. রবিউল ইসলাম এবং যবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মো. রুহুল আমিন।
তাঁরা সবাই নিজ নিজ বক্তব্যে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন, দেশপ্রেম, নেতৃত্বগুণ এবং মানবিক দিকগুলো তুলে ধরেন। অনেক বক্তার কণ্ঠেই ছিল আবেগ, চোখেমুখে ছিল গভীর শোকের ছাপ।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ
এই শোকসভায় যবিপ্রবির বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, দপ্তরপ্রধানসহ নানা বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও অংশ নেন।
সবার উপস্থিতি প্রমাণ করে, বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং তিনি ছিলেন একটি প্রজন্মের প্রেরণা।
কেন্দ্রীয় মসজিদে দোয়া মাহফিল
শোকসভা শেষে বাদ যোহর যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
এই দোয়া মাহফিলে অংশ নিয়ে অনেকেই নীরবে চোখ মুছেছেন, কেউ আবার হাত তুলে প্রার্থনা করেছেন দেশ ও জাতির জন্য নিবেদিত এই নেত্রীর শান্তির জন্য।


