বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমান আবারও প্রমাণ করলেন, বড় মঞ্চে চাপ যত বাড়ে, তাঁর দক্ষতাও তত উজ্জ্বল হয়। কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ পড়ার হতাশা কাটতে না কাটতেই তিনি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে দেখালেন নিজের আসল চেহারা। এক ম্যাচের ব্যবধানে গল্পটা বদলে গেল। কলকাতার সিদ্ধান্তের পরদিনই বিপিএলে শেষ ওভারের অসাধারণ বোলিংয়ে রংপুর রাইডার্সকে এনে দিলেন রুদ্ধশ্বাস জয়। তবু বিস্ময়করভাবে ম্যাচসেরার পুরস্কার উঠল না তাঁর হাতে।
কলকাতা অধ্যায় শেষ, নতুন লড়াইয়ের শুরু
শনিবার বোর্ডের নির্দেশে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স মুস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে ছেঁটে ফেলে। এমন সিদ্ধান্ত যে কোনও ক্রিকেটারের জন্যই মানসিকভাবে কঠিন। কিন্তু মুস্তাফিজের ক্ষেত্রে দৃশ্যপট আলাদা। হতাশাকে শক্তিতে রূপান্তর করার ক্ষমতা তাঁর বহুবার দেখা গেছে। ঠিক সেই কারণেই পরদিন বিপিএলের মাঠে নামার সময় তাঁর চোখে ছিল আত্মবিশ্বাস আর মনোযোগ।
বিপিএলের ম্যাচে রংপুরের টস সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে টস জিতে প্রথমে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকা ক্যাপিটালস। রংপুর রাইডার্স ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে। ঢাকার বোলাররা নতুন বলেই আঁটসাঁট লাইন ও লেংথে আক্রমণ চালান। ফল হিসেবে দ্রুত উইকেট হারাতে থাকে রংপুর।
রংপুরের ইনিংসে শুরুতে ধস
রংপুরের শুরুর তিন ব্যাটারই বড় ইনিংস খেলতে ব্যর্থ হন। মাত্র ৩০ রানের মধ্যে তিনটি উইকেট হারিয়ে দল পড়ে যায় চরম বিপদে। তখন মনে হচ্ছিল, রংপুর হয়তো বড় সংগ্রহ গড়তে পারবে না। কিন্তু এখানেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন অভিজ্ঞ দুই ব্যাটার।
মালান ও মাহমুদুল্লাহর দায়িত্বশীল ব্যাটিং
ইংল্যান্ডের দাউইদ মালান এবং বাংলাদেশের অভিজ্ঞ মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ইনিংস সামাল দেন ঠান্ডা মাথায়। মালান ৩৩ বলে ৩৩ রান করে এক প্রান্ত ধরে রাখেন। অপর প্রান্তে মাহমুদুল্লাহ খেলেন পরিপক্ব ইনিংস। ৪১ বলে তাঁর ৫১ রানের ইনিংসে ছিল প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ আর সঠিক সময়ে আক্রমণ। এই জুটিতেই রংপুর আবার ম্যাচে ফেরে।
শেষদিকে খুশদিল শাহর ঝড়ো ক্যামিও
ইনিংসের শেষ ভাগে পাকিস্তানি অলরাউন্ডার খুশদিল শাহ ব্যাট হাতে ঝড় তোলেন। মাত্র ২১ বলে তিনি করেন ৩৮ রান। তাঁর ইনিংসে ছিল চারটি চার এবং দুটি বিশাল ছক্কা। খুশদিলের আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের কারণেই রংপুর সম্মানজনক সংগ্রহে পৌঁছাতে পারে। নির্ধারিত ২০ ওভারে রংপুর রাইডার্সের স্কোর দাঁড়ায় ১৫৫ রান ৫ উইকেট হারিয়ে।
ঢাকার শক্ত শুরু, ম্যাচের দখল নেওয়ার চেষ্টা
১৫৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ঢাকা ক্যাপিটালস দারুণ সূচনা পায়। ওপেনিং জুটিতে রহমানুল্লাহ গুরবাজ এবং আবদুল্লাহ আল মামুন দ্রুত রান তুলতে থাকেন। গুরবাজ করেন ৩১ রান, মামুন যোগ করেন ২০ রান। মাত্র কয়েক ওভারের মধ্যেই ওপেনিং জুটিতে ৫৪ রান উঠে যায়। তখন ম্যাচ অনেকটাই ঢাকার নিয়ন্ত্রণে।
অধিনায়ক মিঠুনের লড়াকু ইনিংস
ওপেনাররা ফিরে যাওয়ার পর ঢাকার ইনিংস সামাল দেন অধিনায়ক মহম্মদ মিঠুন। তিনি খেলেন দায়িত্বশীল এবং আত্মবিশ্বাসী ইনিংস। অপরাজিত ৫৬ রানের এই ইনিংসে মিঠুন দেখান নেতৃত্বের মানসিকতা। এক প্রান্ত ধরে রেখে তিনি ঢাকাকে জয়ের পথে রাখেন।
মুস্তাফিজুরের বোলিং পরিকল্পনা
ম্যাচের শুরুতে মুস্তাফিজুর রহমানের প্রথম দুই ওভার খুব একটা প্রভাব ফেলেনি। এই দুই ওভারে তিনি দেন ১৭ রান। তবে রংপুরের অধিনায়ক তাঁকে শুরুতেই শেষ করে দেননি। মূল পরিকল্পনা ছিল ডেথ ওভারের জন্য মুস্তাফিজকে তুলে রাখা। এই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
১৮তম ওভারে টার্নিং পয়েন্ট
১৮তম ওভারে বোলিংয়ে এসে মুস্তাফিজুর দেখান তাঁর নিয়ন্ত্রণ। নিখুঁত লাইন এবং গতির পরিবর্তনে তিনি মাত্র ২ রান দেন। এই ওভারেই ঢাকার ওপর চাপ বাড়তে শুরু করে। শেষ দুই ওভারে ম্যাচ যে জমে উঠবে, তা স্পষ্ট হয়ে যায়।
শেষ ওভারের রোমাঞ্চ
শেষ ওভারে ঢাকার জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ১০ রান। ব্যাটিংয়ে তখনও ছিলেন মিঠুন। মুস্তাফিজুর হাতে বল তুলে দেন অধিনায়ক। স্লোয়ার, কাটার আর নিখুঁত ইয়র্কারের মিশেলে মুস্তাফিজ একের পর এক ব্যাটারকে বিভ্রান্ত করেন। পুরো ওভারে ঢাকা তুলতে পারে মাত্র ৪ রান। উইকেট না পেলেও তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংই ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে দেয়।
রংপুরের ৫ রানের জয়
শেষ পর্যন্ত রংপুর রাইডার্স ম্যাচ জিতে নেয় ৫ রানে। ড্রেসিংরুমে উচ্ছ্বাস, মাঠে দর্শকদের করতালি, সব কিছুর কেন্দ্রে ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। কলকাতা থেকে বাদ পড়ার পর এমন পারফরম্যান্স নিঃসন্দেহে তাঁর মানসিক দৃঢ়তার বড় প্রমাণ।
ম্যাচসেরা না হওয়া নিয়ে আলোচনা
এত বড় অবদান রাখার পরও ম্যাচসেরার পুরস্কার না পাওয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয় ক্রিকেট মহলে। পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে যারা ম্যাচের প্রভাব বোঝেন, তাঁদের কাছে মুস্তাফিজই ছিলেন এই জয়ের নায়ক। শেষ ওভারের চাপ সামলে এমন বোলিং সহজ কাজ নয়, বিশেষ করে টি টোয়েন্টি ফরম্যাটে।
পয়েন্ট টেবিলে রংপুরের অবস্থান
এই জয়ের ফলে বিপিএল পয়েন্ট টেবিলে রংপুর রাইডার্স উঠে এসেছে দ্বিতীয় স্থানে। চার ম্যাচে তাদের সংগ্রহ ৬ পয়েন্ট। রান রেটের দিক থেকেও তারা রাজশাহীর চেয়ে এগিয়ে। টুর্নামেন্টের মাঝপথে এসে রংপুর নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
মুস্তাফিজুরের বার্তা
এই ম্যাচ মুস্তাফিজুর রহমানের জন্য শুধু একটি জয় নয়, বরং একটি স্পষ্ট বার্তা। দল থেকে বাদ পড়া মানেই শেষ নয়। সঠিক সুযোগ পেলে তিনি এখনও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। বিপিএলের এই পারফরম্যান্স তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বাড়াবে, আর বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যও এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ইঙ্গিত।


