বলিউড মানেই শুধু রঙিন পর্দা, গান আর গ্ল্যামার নয়। এর আড়ালেই থাকে সম্পর্কের টানাপড়েন, গুঞ্জন আর ভুল বোঝাবুঝির দীর্ঘ ইতিহাস। শাহরুখ খান ও প্রিয়ঙ্কা চোপড়ার সম্পর্ক ঠিক তেমনই এক আলোচিত অধ্যায়। এক সময় এই দুই তারকার নাম জড়িয়ে বলিউডে যত আলোচনা হয়েছে, ততটাই উঠে এসেছে বন্ধুত্ব, সম্মান আর পেশাদার সম্পর্কের গুরুত্ব।
‘ডন’ ছবির সেট থেকে শুরু আলোচনার ঝড়
শাহরুখ খান ও প্রিয়ঙ্কা চোপড়া প্রথম বড় পরিসরে একসঙ্গে কাজ করেন ‘ডন’ ছবিতে। এই ছবিই তাঁদের জুটিকে জনপ্রিয় করে তোলে। ক্যামেরার সামনে তাঁদের রসায়ন দর্শকের নজর কাড়ে। আবার ক্যামেরার বাইরেও একে অপরের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতা লুকোনো ছিল না।
প্রিয়ঙ্কা নিজেই একাধিকবার জানিয়েছেন, শাহরুখের সঙ্গে কাজ করা তাঁর কাছে স্বপ্নের মতো ছিল। শাহরুখও কখনও অস্বীকার করেননি যে প্রিয়ঙ্কা তাঁর খুব কাছের একজন মানুষ। কিন্তু ঠিক এই জায়গা থেকেই শুরু হয় গুঞ্জন। পেশাদার বন্ধুত্বকে অনেকেই অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন।
বলিউডে সম্পর্কের গুঞ্জন কেন এত সহজে ছড়ায়
বলিউডে একজন অভিনেতা ও অভিনেত্রীর মধ্যে ঘনিষ্ঠতা মানেই যে সম্পর্ক, এই ধারণা বহু পুরনো। শাহরুখ–প্রিয়ঙ্কার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। একের পর এক কটাক্ষ, প্রশ্ন আর ইঙ্গিত প্রিয়ঙ্কাকে নিশানা করে। এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দেন শাহরুখ খান।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, একজন মহিলা তাঁর সঙ্গে কাজ করলেই কেন তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠবে? এই মানসিকতা শুধু অসম্মানজনক নয়, বরং গভীরভাবে আঘাত করে একজন মানুষের আত্মসম্মানে।
প্রিয়ঙ্কার পাশে দাঁড়ান শাহরুখ খান
শাহরুখ খান বরাবরই মহিলাদের সম্মান দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। প্রিয়ঙ্কাকে ঘিরে কটাক্ষ বাড়তেই তিনি বলেন, প্রিয়ঙ্কা তাঁর বন্ধু। খুব কাছের বন্ধু। বন্ধুত্ব মানেই বিশ্বাস, সম্মান আর পাশে থাকা।
তিনি আরও জানান, এই দুঃখ তাঁর নিজের জন্য নয়। দুঃখ এই কারণে যে তাঁর সঙ্গে কাজ করার অপরাধে একজন অভিনেত্রীকে সমাজের প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। এই বিষয়টিই তাঁকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
‘ও একটা ছোট্ট মেয়ে’—শাহরুখের আবেগঘন মন্তব্য
শাহরুখ খান এক সাক্ষাৎকারে আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, প্রিয়ঙ্কা তাঁর মনের খুব কাছের একজন মানুষ। তিনি বলেন, “ও একটা ছোট্ট মেয়ে। মিস ইন্ডিয়া, মিস ওয়ার্ল্ড হয়ে বলিউডে এসেছে। তারপর আমার সঙ্গে কাজ করেছে। আমরা ক্যামেরার সামনে আর পিছনে অনেক সুন্দর মুহূর্ত ভাগ করে নিয়েছি।”
এই কথার মধ্যে ছিল একজন বন্ধুর মমতা। একজন সিনিয়র অভিনেতার দায়িত্ববোধ। তিনি পরিষ্কার করে দেন, কাজ করতে গিয়ে সম্পর্ক তৈরি হয়। কিন্তু অহেতুক গুঞ্জন সেই সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়।
বলিউড ছেড়ে হলিউডে প্রিয়ঙ্কার নতুন যাত্রা
এক সময় প্রিয়ঙ্কা চোপড়া বলিউড ছেড়ে হলিউডে পাড়ি জমান। তাঁর এই সিদ্ধান্ত নিয়েও নানা আলোচনা হয়। অনেকেই দাবি করেন, বলিউডের অস্বস্তিকর পরিস্থিতিই নাকি তাঁকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। যদিও প্রিয়ঙ্কা নিজে সবসময় বলেছেন, তাঁর লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।
হলিউডে গিয়ে প্রিয়ঙ্কা নিজের জায়গা তৈরি করেন। আন্তর্জাতিক তারকা হিসেবে পরিচিতি পান। কিন্তু বলিউডের অতীত আর শাহরুখের সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জন তাঁকে পিছু ছাড়েনি দীর্ঘদিন।
বন্ধুত্বের জায়গায় ভাটা পড়লে কষ্টটা গভীর হয়
শাহরুখ খান একাধিকবার বলেছেন, বন্ধুত্বে ফাটল ধরলে সেটা খুব কষ্টের। বিশেষ করে যখন সেই ফাটলের কারণ হয় ভিত্তিহীন কথা। তিনি বিশ্বাস করেন, সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস।
প্রিয়ঙ্কার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব নিয়েও তিনি বলেন, আজও তিনি তাঁকে খুব কাছের মানুষ হিসেবেই দেখেন। ভবিষ্যতেও দেখবেন। সময় বদলালেও অনুভূতির জায়গা বদলায় না।
তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন ও সমাজের দায়
শাহরুখ–প্রিয়ঙ্কা প্রসঙ্গ বলিউডে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে। একজন তারকার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমাজের অতিরিক্ত আগ্রহ কতটা ন্যায্য? কাজের সম্পর্ককে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বানিয়ে দেওয়ার প্রবণতা কেন আজও থামেনি?
শাহরুখ খান এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়েই বলেন, সম্মানটাই আসল। একজন মহিলা সহকর্মীর সম্মান রক্ষা করা শুধু ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়, সামাজিক দায়িত্বও।
আজকের দিনে এই সম্পর্ককে কীভাবে দেখা হয়
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গুঞ্জনের ঝড় অনেকটাই থিতিয়ে গেছে। আজ শাহরুখ খান বলিউডের বাদশা হিসেবেই নিজের জায়গায় অটল। প্রিয়ঙ্কা চোপড়া আন্তর্জাতিক তারকা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত নাম। তাঁদের পথ আলাদা হলেও, এক সময়ের বন্ধুত্ব আর স্মৃতি এখনও আলোচনার বিষয়।
এই গল্প শুধু দুই তারকার নয়। এটি বলিউডের অন্দরমহলের বাস্তব ছবি। যেখানে সম্পর্ক, সম্মান আর গুঞ্জনের লড়াই প্রতিদিন চলতেই থাকে।
শেষ কথা:
শাহরুখ খান ও প্রিয়ঙ্কা চোপড়ার সম্পর্ক নিয়ে যত কথাই হোক না কেন, একটি বিষয় স্পষ্ট। শাহরুখ সবসময় প্রিয়ঙ্কাকে বন্ধু হিসেবে সম্মান করেছেন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। আর এই মনোভাবই তাঁকে শুধু একজন সফল অভিনেতা নয়, একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবেও আলাদা করে তোলে।
বলিউডে কাজ করতে গিয়ে সম্পর্ক তৈরি হয়। কিন্তু সেই সম্পর্ককে সম্মানের চোখে দেখাই সবচেয়ে জরুরি। শাহরুখ–প্রিয়ঙ্কা অধ্যায় আমাদের ঠিক এই কথাটাই বারবার মনে করিয়ে দেয়।


