ঢাকার গুলশানের নর্দা এলাকায় এক নারীকে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে গায়ে পানি ঢালার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়। ঘটনাটি দেখে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন, আবার অনেক প্রশ্নও উঠে আসে—কে এই নারী, কেন এমন করা হলো, আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
এই ঘটনার পর গুলশান থানার পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করে এবং ইতোমধ্যে পাঁচজনকে আটক করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট জানার চেষ্টা চলছে এবং ভুক্তভোগী নারীকে খুঁজে বের করার কাজও চলমান।
কোথায় এবং কীভাবে ঘটনাটি ঘটে
পুলিশ জানায়, ঘটনাটি ঘটে গুলশানের নর্দা এলাকার একটি পুরুষ ছাত্রদের মাদ্রাসার সামনে। গুলশান জোনের পুলিশের সহকারী কমিশনার আলী আহমেদ মাসুদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করেই প্রথমে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা হয়। এরপর স্থানীয়ভাবে অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশের তৎপরতা
ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরপরই পুলিশ নড়েচড়ে বসে। কারণ প্রকাশ্যে একজন নারীকে এভাবে খুঁটিতে বেঁধে নির্যাতনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগও সামনে আসে।
পুলিশ জানিয়েছে, শুধুমাত্র ভিডিও নয়, ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং আটককৃতদের জবানবন্দি মিলিয়ে পুরো ঘটনাটি বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পুলিশ কী বলছে আটক ব্যক্তিদের বক্তব্য নিয়ে
পুলিশের কাছে আটককৃতরা যে তথ্য দিয়েছে, তার ভিত্তিতে একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেছে। তাদের ভাষ্যমতে, ঘটনার দুই দিন আগে ওই নারী নর্দা এলাকার একটি স্থানীয় মাদ্রাসার ভেতরে প্রবেশ করেন।
সময়টি ছিল খুব ভোর। সে সময় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছিল। তাদের পাঞ্জাবি ও অন্যান্য পোশাক হ্যাঙ্গারে ঝুলানো ছিল বলে পুলিশকে জানিয়েছে আটককৃতরা।
চুরির সন্দেহ কীভাবে তৈরি হয়
আটককৃতদের বরাতে পুলিশ জানায়, ওই নারী মাদ্রাসার একটি ফ্লোরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ঝুলানো পাঞ্জাবির পকেটে হাত দেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি দেখে কয়েকজন ছাত্র চোর সন্দেহে চিৎকার শুরু করে।
চিৎকার শুনে অন্য শিক্ষার্থী ও আশপাশের স্থানীয় লোকজন সেখানে জড়ো হন। এরপর ওই নারীকে আটক করে মাদ্রাসার বাইরে নিয়ে আসা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে নারীর বক্তব্য নিয়ে বিভ্রান্তি
পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে ওই নারী প্রথমে দাবি করেন, তিনি তার মেয়েকে মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে এসেছিলেন। পরে মাদ্রাসাটি যে শুধু ছেলেদের জন্য—এ কথা জানানো হলে তিনি বক্তব্য বদলে বলেন, তিনি ছেলেকে ভর্তি করাতে এসেছেন।
এই বক্তব্যের পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও সন্দেহজনক করে তোলে বলে দাবি আটককৃতদের। এক পর্যায়ে ওই নারী নিজেকে যৌনকর্মী বলেও পরিচয় দিয়েছেন বলে তারা পুলিশকে জানিয়েছে।
কেন খুঁটিতে বেঁধে পানি ঢালা হলো
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই। চুরির সন্দেহ থাকলেও একজন মানুষকে প্রকাশ্যে খুঁটিতে বেঁধে পানি ঢালার মতো আচরণ কেন করা হলো?
পুলিশ বলছে, এটি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। চুরির সন্দেহ হলেও কাউকে এভাবে শাস্তি দেওয়ার কোনো আইনগত অধিকার কারও নেই। এই দিকটি তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভুক্তভোগী নারী এখন কোথায়
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো—ভুক্তভোগী নারী বর্তমানে কোথায় আছেন, তা পুলিশ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি। আলী আহমেদ মাসুদ জানান, নারীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
নারীকে পাওয়া গেলে তার বক্তব্য নেওয়া হবে এবং তিনি কোনো নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মানবাধিকার ও আইনের প্রশ্ন
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি সামনে এসেছে। চুরির অভিযোগ থাকলেও একজন নারীকে প্রকাশ্যে অপমান ও শারীরিকভাবে হেনস্তা করা আইনত অপরাধ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য, অপরাধ সন্দেহ হলে পুলিশকে জানানোই একমাত্র বৈধ পথ। নিজের হাতে বিচার তুলে নেওয়া সমাজে ভয়ংকর নজির তৈরি করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই ঘটনার নিন্দা করেছেন। কেউ কেউ আবার পুরো ঘটনা না জেনে মন্তব্য করায় বিভ্রান্তিও তৈরি হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, গুজব বা অপপ্রচার থেকে বিরত থাকতে এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংযত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
পুলিশ কী পদক্ষেপ নিচ্ছে
পুলিশ জানিয়েছে, আটক পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন কর্মকর্তারা।
শেষ কথা
গুলশানের নর্দা এলাকার এই ঘটনাটি শুধু একটি অপরাধের অভিযোগ নয়, বরং আইন, মানবাধিকার ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। চুরির সন্দেহ থাকলেও কাউকে এভাবে নির্যাতন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
পুলিশের তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত সত্য সামনে আসবে। তবে এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়—আইন সবার জন্য, আর বিচার করার অধিকার কেবল রাষ্ট্রের।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।


