নজরুল ইসলাম নজরুল: ফুটবল বিশ্বে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র
নজরুল ইসলাম নজরুল, জন্ম ১৯৪৮ সালে, যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার মোবারকপুর গ্রামে, ছিলেন বাংলাদেশের এক সময়কার প্রখ্যাত ও প্রতিভাবান ফুটবল খেলোয়াড়। তাঁর জীবন ও ক্রীড়াঙ্গনে অবদান আমাদের ক্রীড়াতিহাসের গর্ব। নজরুল কেবল একজন প্রতিভাবান খেলোয়াড় ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি ক্রীড়া পরিবারে বেড়ে ওঠা এক জীবন্ত প্রেরণা।
ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া পরিবার থেকে উঠে আসা
নজরুল ইসলামের পিতা আব্দুস সাত্তার নিজেও ছিলেন একজন কৃতি ফুটবল খেলোয়াড়। এই পরিবারে ক্রীড়ার প্রতি আগ্রহ ও অনুরাগ ছিল স্বাভাবিক। তাঁর মাতামহ ছিলেন মহেশপুর চৌধুরী বাড়ির জাফর চৌধুরী – সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও সুপরিচিত এক নাম। নজরুলের মাতুলগণ মমতাজ চৌধুরী এবং কাওসার চৌধুরী – দু’জনই নিজেদের সময়ে খ্যাতিমান ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। পরিবার থেকেই তিনি পেয়েছিলেন এক দুর্দান্ত ক্রীড়া আবহ।
শৈশব ও পড়ালেখা: ক্রীড়ার সঙ্গে সহযাত্রা
নজরুল ইসলাম নজরুল ছিলেন ভাই-বোনদের মধ্যে দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল অগাধ। মাঠে ছুটে চলা, পায়ের নিপুণ কাজ, বলের প্রতি নিয়ন্ত্রণ – প্রতিটি ধাপে ফুটবল তাঁকে টেনেছিল জীবনের গভীর থেকে। স্থানীয় পর্যায়ের ফুটবল প্রতিযোগিতাগুলোয় তাঁর কৌশল আর গতি তাক লাগিয়ে দিত।
যশোর জেলা ফুটবল দলের প্রধান স্তম্ভ
নজরুল ইসলামের ফুটবল জীবনের প্রকৃত প্রস্ফুটন ঘটে যশোর জেলা দল এর মাধ্যমে। তিনি এই দলের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন। ১৯৬৮ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান রানার্স আপ দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে নির্বাচিত হন, যা তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি ও সময়ের অন্যতম সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই পর্যায়েই নজরুল ইসলাম নজরুল জাতীয় পর্যায়ে নজরে আসেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর খেলা প্রশংসিত হয়, বিশেষত যশোরের দর্শকদের জন্য তিনি হয়ে ওঠেন এক “নায়ক”।
ঢাকায় ফায়ার সার্ভিস এবং জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য
ঢাকায় পাড়ি জমানোর পর নজরুল ইসলাম নজরুল “ফায়ার সার্ভিস” ফুটবল টিমের নিয়মিত সদস্য হন। এখানে তিনি শুধুমাত্র একজন খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বরং একজন কৌশলী মিডফিল্ডার ও গোল সৃষ্টিকারী প্লেয়ার হিসেবে আলাদা পরিচিতি অর্জন করেন।
এই দলের হয়ে বহু ম্যাচে তিনি দলের জয়ে মুখ্য ভূমিকা রাখেন। মাঠে তাঁর উপস্থিতি মানেই দর্শকদের উত্তেজনা ও আনন্দ। তাঁর খেলার ধরন ছিল ইউরোপীয় প্যাটার্নের কাছাকাছি – নিখুঁত পাস, দুর্দান্ত ড্রিবল, আর দূরপাল্লার শট ছিল নজরকাড়া।
আন্তর্জাতিক জীবনে এক নতুন অধ্যায়: বিবাহ ও প্রবাসজীবন
১৯৮০ সালে, বিদেশে অবস্থানকালে নজরুল ইসলাম বিবাহ করেন একজন ব্রিটিশ নারী, ইভোন-কে। পরবর্তীতে তিনি স্থায়ীভাবে লন্ডনে বসবাস শুরু করেন। তবে, ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। লন্ডনে বসে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ ও পরিচালনায় তিনি যুক্ত থাকতেন।
লন্ডনে বসবাস করলেও তাঁর হৃদয় পড়ে থাকত নিজ জন্মভূমি মোবারকপুর ও বাংলাদেশের ফুটবল মাঠে।
কর্মজীবনে সফল ব্যবসায়ী
ফুটবল ছাড়াও নজরুল ইসলাম নজরুল নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম, সততা ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব পরিচিতি। তবে ক্রীড়াপ্রেমিক নজরুল কখনোই ফুটবলকে ভুলে যাননি – বাংলাদেশি তরুণ প্রজন্মের ফুটবল প্রতিভা খোঁজার ক্ষেত্রে তিনিও এক সময় সক্রিয় ছিলেন।
নজরুল ইসলামের অবদান ও প্রভাব
নজরুল ইসলাম নজরুলের জীবনের গল্প নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে। তিনি দেখিয়ে গেছেন কিভাবে প্রতিকূলতাকে জয় করে, দেশের গর্ব হওয়া যায়।
বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে নজরুলের নাম একটি অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। তাঁর খেলার ভিডিও, সাক্ষাৎকার কিংবা মাঠের অভিজ্ঞতা আমাদের আজও অনুপ্রাণিত করে। যশোর জেলা বা ঢাকা শহরে অনেকেই আজও স্মরণ করেন তাঁর দুর্দান্ত গোল বা খেলার মুহূর্ত।
এক বিস্মৃত নায়কের পুনরুজ্জীবন প্রয়োজন
আজ যখন আমরা বাংলাদেশের ফুটবলকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি, তখন নজরুল ইসলাম নজরুলের মতো প্রতিভাদের স্মরণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন বলে – “অধ্যবসায়, প্রতিভা ও দায়িত্ববোধ একজন খেলোয়াড়কে কিংবদন্তি করে তোলে।”
নজরুল ইসলাম নজরুল শুধু মোবারকপুরের নয়, তিনি ছিলেন গোটা বাংলাদেশের ক্রীড়া ঐতিহ্যের অহংকার। আমাদের উচিত তাঁকে যথাযথ সম্মান ও স্মরণীয় করে তোলা।


