ছারপোকার নাম শুনলেই আমাদের বেশিরভাগের কপালে ভাঁজ পড়ে। ঘুমের শান্তি নষ্ট করা, শরীরে লাল ফোসকা তুলে দেওয়া—এই ছোট্ট রক্তচোষা কীটকে আমরা সবাই শত্রু হিসেবেই চিনি। কিন্তু ভাবুন তো, যে ছারপোকাকে ঘরছাড়া করতে আমরা কত চেষ্টা করি, সেই ছারপোকাই যদি একদিন অপরাধ রহস্যভেদে গোয়েন্দার ভূমিকায় নেমে পড়ে? অবাক লাগলেও বিজ্ঞান বলছে, এমন দিন আর খুব দূরে নয়।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ছারপোকার দেহে লুকিয়ে থাকতে পারে অপরাধীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ঠিক যেন জীবন্ত প্রমাণ। এই গবেষণা অপরাধ তদন্তের জগতে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
ছারপোকার স্বভাব ও মানুষের আতঙ্ক
ছারপোকা সাধারণত বিছানা, বালিশ, সোফা, চেয়ার বা কাঠের আসবাবের কোণায় লুকিয়ে থাকতে ভালোবাসে। রাত হলেই তারা বেরিয়ে আসে রক্তের খোঁজে। একবার যদি কোনও ঘরে ছারপোকা বাসা বাঁধে, তাহলে সেখানকার মানুষের দুর্ভোগ শুরু হয়। কারণ এরা খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে।
বাইরের জায়গা থেকেও ছারপোকা সহজে বাড়িতে ঢুকে পড়ে। জামাকাপড়ের ভাঁজ, ব্যাগ কিংবা জুতোর ভেতরে লুকিয়ে এরা অজান্তেই ঘরে চলে আসে। তাই হোটেল বা ভ্রমণ শেষে অনেক সময় মানুষ না চাইলেও ছারপোকার আতিথ্য পেয়ে বসে।
বিজ্ঞান বদলে দিল ছারপোকা সম্পর্কে ধারণা
এই চেনা আতঙ্কের গল্পের মাঝেই এক নতুন তথ্য সামনে এনেছেন মালয়েশিয়ার বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। তাঁদের গবেষণায় জানা গেছে, ছারপোকা কোনও মানুষের রক্ত পান করার পর সেই মানুষের ডিএনএ প্রায় ৪৫ দিন পর্যন্ত ছারপোকার দেহে থেকে যায়।
এই ডিএনএ পরীক্ষা করে জানা সম্ভব সেই মানুষের ত্বকের রং, চোখের রং এমনকি চুলের রং পর্যন্ত। অর্থাৎ, ছারপোকা শুধু কামড়েই থেমে থাকে না, সে নিজের দেহে রেখে দেয় গুরুত্বপূর্ণ জৈব প্রমাণ।
অপরাধস্থলে ছারপোকা মানেই সূত্র
ধরা যাক, কোথাও কোনও অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং অপরাধী পালিয়ে গেছে। তদন্তকারীরা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছান, তখন হয়তো তেমন কোনও স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেল না। কিন্তু যদি সেই জায়গায় ছারপোকার অস্তিত্ব মেলে, তাহলে গল্পটা বদলে যেতে পারে।
গবেষকদের মতে, যদি কোনও ব্যক্তি কোনও জায়গায় কিছুক্ষণ বসে বা অবস্থান করে, তাহলে তাকে ছারপোকা কামড়ানোর সম্ভাবনা খুবই বেশি। কারণ ছারপোকা সাধারণত মানুষের কাছেই থাকে। ফলে অপরাধস্থলে থাকা ছারপোকাদের সংগ্রহ করে পরীক্ষা করলে, সেখানে উপস্থিত ব্যক্তির পরিচয় সংক্রান্ত নানা তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
ডিএনএ বিশ্লেষণে মিলবে পলাতকের পরিচয়
ছারপোকার দেহে থাকা ডিএনএ আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিশ্লেষণ করা হলে, অপরাধীর শারীরিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। এতে তদন্তকারীরা সন্দেহভাজন ব্যক্তির তালিকা ছোট করতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে ফরেনসিক তদন্তে ছারপোকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে গণ্য হতে পারে। যেমন আজ আঙুলের ছাপ বা রক্তের নমুনা ব্যবহৃত হয়, তেমনই একদিন ছারপোকাও হয়ে উঠতে পারে অপরাধ তদন্তের নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার।
ছারপোকা বনাম আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞান
এখনকার দিনে অপরাধ তদন্ত অনেকটাই নির্ভর করে প্রযুক্তির ওপর। সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল লোকেশন, ডিএনএ রিপোর্ট—সব মিলিয়ে তদন্ত এগোয়। ছারপোকার মাধ্যমে পাওয়া ডিএনএ এই প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
কারণ অনেক সময় অপরাধী খুব সাবধানে কাজ করে। সে কোনও রক্তের দাগ বা স্পষ্ট চিহ্ন রেখে যায় না। কিন্তু ছারপোকাকে ফাঁকি দেওয়া প্রায় অসম্ভব। সে নিজের কাজ করে যায় নীরবে, আর রেখে দেয় অপরাধীর জৈব ছাপ।
ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহার হতে পারে এই পদ্ধতি
গবেষকরা মনে করছেন, আগামী দিনে পুলিশ ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হতে পারে, যাতে তারা অপরাধস্থল থেকে ছারপোকা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে পারেন। সঠিকভাবে এই কীট সংগ্রহ করলে এবং পরীক্ষাগারে পাঠালে তদন্তে বড় সাফল্য আসতে পারে।
এটি বিশেষ করে সেই সব ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে, যেখানে অপরাধ ঘটেছে বন্ধ ঘরে, হোটেল রুমে বা পুরনো বাড়িতে। এই ধরনের জায়গায় ছারপোকার উপস্থিতি বেশি থাকে।
আতঙ্ক থেকে সহায়ক শক্তিতে রূপান্তর
যে ছারপোকাকে আমরা এতদিন শুধু বিরক্তির কারণ ভেবেছি, বিজ্ঞান তাকেই নতুন চোখে দেখাচ্ছে। অবশ্য এর মানে এই নয় যে আমরা ছারপোকাকে স্বাগত জানাব। কিন্তু এটুকু বলা যায়, এই রক্তচোষা কীটেরও সমাজে এক অদ্ভুত ভূমিকা তৈরি হতে চলেছে।
অপরাধ রহস্যভেদে ছারপোকার এই ভূমিকা প্রমাণ করে, প্রকৃতির ছোট্ট প্রাণীরাও কত বড় কাজে আসতে পারে। আজ যে ছারপোকা আমাদের ঘুম নষ্ট করে, আগামী দিনে সে-ই হয়তো অপরাধী ধরার নীরব সাক্ষী হয়ে উঠবে।
শেষ কথা
বিজ্ঞান প্রতিদিন আমাদের চেনা জগৎকে নতুনভাবে চিনতে শেখাচ্ছে। ছারপোকা তারই এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। আতঙ্কের প্রতীক থেকে সম্ভাব্য গোয়েন্দা—এই রূপান্তর নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ।
ভবিষ্যতে অপরাধ তদন্তে ছারপোকার ভূমিকা কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলবে। তবে একথা নিশ্চিত, এই গবেষণা ফরেনসিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।


