জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠে এবার বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। দলের মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীরা লড়াই শুরু করেছেন, যা তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলকে বিপাকে ফেলেছে। বিএনপি যদিও অনেককে বহিষ্কার করেছে এবং আলোচনায় ডেকেছে, তবুও অর্ধশতাধিক আসনে বিদ্রোহীরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করছেন না।
ঢাকা-১২: মনোনয়ন বিতর্কের উত্তেজনা
ঢাকা-১২ আসনে মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব প্রথমে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তবে জোটের সমীকরণ বিবেচনায় পরে আসনটি দেওয়া হয় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাইফুল হকের কাছে। ক্ষুব্ধ নীরব স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন এবং দল সমর্থিত প্রার্থীর সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করেন।
নীরব জানান, “জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনো দলের নেতাদের জন্য নয়। এটি জনগণের নির্বাচন। আমি জনগণের চাওয়ামতো কাজ করব। অন্য কোনো পথ এখানে গ্রহণযোগ্য নয়।”
জোটসঙ্গী ও স্থানীয় দ্বন্দ্ব
কিছু এলাকায় নির্বাচনের আগে থেকেই স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল, যা চূড়ান্ত মনোনয়ন ঘোষণার পর আরও বেড়ে গেছে। জোটসঙ্গীদের প্রার্থী মনোনীত হলেও মনোনয়ন বঞ্চিতরা অনেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এর মধ্যে নয়জনকে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিনে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে আলোচনায় ডেকে কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছেন। ব্রাক্ষণবাড়িয়া-৬ আসনের আবদুল খালেক এর একমাত্র উদাহরণ।
পটুয়াখালী-৩: স্বতন্ত্র প্রার্থীর তীব্র বক্তব্য
পটুয়াখালী-৩-এর স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন বলেন, “পার্টি অফিস ভাঙা হয়েছে, নেতাকর্মীরা আক্রান্ত হয়েছেন। ভোটাররা যেভাবে গণঅধিকার প্রয়োগ করবে, তা আমি জনগণের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারি না। পাঁচ লাখ ভোটারের সঙ্গে মুনাফিকি করে রাজনীতি করা সম্ভব নয়। তাই আমি জনগণের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।”
এই অবস্থায় শুধু জোটপ্রার্থী নয়, ধানের শীষ প্রার্থীর বিরুদ্ধেও স্বতন্ত্র নেতা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এর ফলে তৃণমূল বিভক্ত হয়েছে এবং কিছু এলাকায় সংঘর্ষও দেখা দিয়েছে।
নাটোর-৩: দলের প্রতি দায়িত্ববোধ
নাটোর-৩-এর স্বতন্ত্র প্রার্থী দাউদার মাহমুদ বলেন, “আমি মনে করি, আমি বিএনপির পক্ষেই ভোট দিচ্ছি। আমি যদি ভোট না দিই, দলীয় প্রার্থী হেরে যাবে। তবে দল যদি আমাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে আমাদের কিছু করার নেই।”
এটি স্পষ্ট করে যে, স্বতন্ত্র প্রার্থীর উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত নয়, বরং দলকে জোরদার করার চেষ্টা।
দলের উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকায় ডাকছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে। অঞ্চলভিত্তিক কমিটি গঠন করে মনোনয়ন প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হচ্ছে। যদিও হাতে গোনা কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহারে রাজি হয়েছেন, তবুও অধিকাংশ এখনও অনড়।
বিএনপির শীর্ষ নেতারা আশা করছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মনোনয়ন প্রত্যাহারের সংখ্যা সন্তোষজনক পর্যায়ে নেমে আসবে। স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “রাজনীতিতে শেষ কোনো শব্দ নেই। মনোনয়ন প্রক্রিয়া শেষ হলে সবাই দলের মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে কাজ করবে। দলের শৃঙ্খলা রক্ষা করাই মূল লক্ষ্য। দলের বাইরে গিয়ে রাজনীতি করা সম্ভব নয়।”
বিদ্রোহীদের ভবিষ্যত মূল্যায়ন
বিএনপি জানাচ্ছে, দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে ভোটে অংশ নেওয়া বিদ্রোহীদের ভবিষ্যতে বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা হবে। এর মাধ্যমে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দলের ঐক্য রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে।
স্বতন্ত্র ও দলীয় প্রার্থীর লড়াই এখন ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে দলের নেতৃত্বের তৎপরতা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহারে উৎসাহ জোরদার করার চেষ্টা আগামী নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।


