প্রারম্ভিকা: যশোরের খড়কি থেকে দেশের মঞ্চে
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে কিছু নাম চিরন্তনভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। মোঃ খায়েরুজ্জামান বাবু সেই বিরল ক্রিকেটারদের একজন, যিনি শুধু নিজের প্রতিভা দিয়ে নয়, বরং অক্লান্ত পরিশ্রম, নেতৃত্বগুণ ও নিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাঁর জন্ম যশোর শহরের খড়কি এলাকায়, ১৯৬৭ সালের ১৭ই এপ্রিল। পিতা মোঃ আব্দুর রউফ, যিনি ছিলেন জেলা বোর্ডের হিসাব রক্ষক, এবং মা ছিলেন একজন স্নেহময়ী গৃহিণী। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে বাবু ছিলেন তৃতীয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হিসেবে তিনি এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।
প্রথম জীবন ও কর্মজীবন
খেলাধুলার পাশাপাশি মোঃ খায়েরুজ্জামান বাবু একটি প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী জীবনও গড়ে তোলেন। ১৯৯৩ সালে তিনি “একমি ল্যাবরেটরি”-তে চাকরি গ্রহণ করেন। তবে কর্মজীবনের চাপ তাকে ক্রিকেট থেকে দূরে সরাতে পারেনি। বরং, তিনি আরও দায়িত্বশীল ও পরিণত হয়ে মাঠে ফিরে আসেন।
যশোর লীগের দীর্ঘ ও গৌরবোজ্জ্বল ক্যারিয়ার
মোঃ খায়েরুজ্জামান বাবুর ক্রিকেট যাত্রা শুরু হয় যশোর লীগ থেকে। নিচে তাঁর বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলার তালিকা উল্লেখ করা হলো যা প্রমাণ করে তার দৃঢ়তা ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিশ্রুতি—
- ১৯৮২-১৯৮৩: আব্দুল হাই স্মৃতি সংঘ
- ১৯৮৩-১৯৮৪, ১৯৯৪-১৯৯৫: ছাত্র সংঘ
- ১৯৮৫-১৯৯০, ১৯৯৩, ১৯৯৭: আসাদ স্মৃতি সংঘ
- ১৯৯৩-১৯৯৪: রাইজিং ষ্টার
- ১৯৯৭-১৯৯৮: পৌরপাড়া (পপস)
- ১৯৯৮-১৯৯৯: প্যাগাসাস
এই দীর্ঘসময় তিনি যশোরের মাঠ কাঁপিয়ে রেখেছেন দক্ষতা ও নৈপুণ্যের মাধ্যমে।
ঢাকা লীগে উত্তরণ ও প্রতিষ্ঠা
মোঃ খায়েরুজ্জামান বাবুর প্রতিভা শুধু যশোরে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তিনি নিজেকে তুলে ধরেছেন ঢাকা লীগের প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে। তাঁর ক্লাব ক্যারিয়ারে রয়েছে কিছু বিখ্যাত নাম—
- ১৯৮৪-১৯৮৫: ব্রাদার্স ইউনিয়ন
- ১৯৮৫-১৯৮৬, ১৯৮৬-১৯৮৭, ১৯৯৫-১৯৯৭: ভিক্টোরিয়া ক্লাব
- ১৯৮৭-১৯৮৮: জিএমসিসি (REB)
- ১৯৮৮-১৯৯০: নির্মাণ একাদশ
- ১৯৯০-১৯৯৪: আবাহনী ক্লাব
- ১৯৯৪-১৯৯৫: ব্রাদার্স ইউনিয়ন (পুনরায়)
- ১৯৯৭-২০০০: সূর্যতরুণ ক্লাব
ঢাকা লীগের এই অভিজ্ঞতাসমূহ তাকে দেশের ক্রিকেট মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
যশোর জেলা দলের অধিনায়কত্ব ও নেতৃত্বগুণ
১৯৯১ সাল থেকে টানা ছয় বছর তিনি ছিলেন যশোর জেলা ক্রিকেট দলের অধিনায়ক। তাঁর নেতৃত্বে যশোর জেলা দল অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে এবং তরুণ খেলোয়াড়রা অনুপ্রাণিত হন।
জাতীয় ক্রিকেট লীগ ও বিভাগীয় নেতৃত্ব
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে প্রথম জাতীয় ক্রিকেট লীগ (১৯৯৯-২০০০)-এর মাধ্যমে। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে খুলনা বিভাগের অধিনায়কের দায়িত্ব পান মোঃ খায়েরুজ্জামান বাবু। তাঁর নেতৃত্বে খুলনা বিভাগ শক্তিশালী পারফরম্যান্স করে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগে নিজেদের জায়গা করে নেয়।
এছাড়া, ১৯৯৯ সালে খুলনা বিভাগীয় লীগেও তিনি অধিনায়ক ছিলেন। তার কৌশলী সিদ্ধান্ত ও দৃঢ় মনোবল তাকে একজন স্বনামধন্য ক্যাপ্টেন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ স্বীকৃতি
১৯৯২-১৯৯৩ ক্রীড়া বর্ষে, তিনি পেয়েছেন যশোর জেলার ক্রীড়া সাংবাদিকদের সংগঠন “বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি”-এর বর্ষসেরা ক্রিকেটার খেতাব। এটি কেবল তার খেলোয়াড়ি দক্ষতার স্বীকৃতি নয়, বরং দীর্ঘদিনের সৎ ও নিষ্ঠাবান ক্রিকেটীয় মনোভাবের ফল।
ক্রীড়া জগতে প্রভাব ও উত্তরাধিকার
মোঃ খায়েরুজ্জামান বাবুর মতো খেলোয়াড়েরা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। তার ক্রীড়াজীবনের বিশাল ব্যাপ্তি এবং আন্তরিকতা প্রমাণ করে যে সাফল্যের জন্য কেবল প্রতিভা নয়, পরিশ্রম, নিষ্ঠা এবং আত্মনিবেদনও সমান জরুরি। তিনি আজও যশোর তথা বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
এক জীবন্ত কিংবদন্তি
মোঃ খায়েরুজ্জামান বাবুর জীবন শুধু একজন খেলোয়াড়ের কাহিনি নয়, এটি এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তাঁর ক্যারিয়ার প্রমাণ করে যে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও কেউ যদি কঠোর পরিশ্রম করে, তবে সে জাতীয় পর্যায়ে নিজের জায়গা করে নিতে পারে। ক্রিকেটপ্রেমী সমাজ তার এই অবদানের কথা চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।


