বলিউড অভিনেত্রী সেলিনা জেটলিকে ঘিরে ফের তীব্র চাঞ্চল্য। দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর নিজের দাম্পত্য জীবনের অন্ধকার দিক প্রকাশ্যে আনলেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা স্বামী পিটার হগের বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য হিংসা, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, জোরপূর্বক অস্বাভাবিক যৌনাচার এবং ভয় দেখানোর মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন অভিনেত্রী। সেলিনার দাবি অনুযায়ী, তাঁদের ১৫তম বিবাহবার্ষিকীর দিনই তাঁকে ডিভোর্সের নোটিস ধরিয়ে দেওয়া হয়, যা তাঁর জীবনের অন্যতম ভয়ংকর অভিজ্ঞতা।
বিবাহবার্ষিকীর উপহারে ডিভোর্স নোটিস
সেলিনা জেটলির বক্তব্য অনুযায়ী, বিবাহবার্ষিকীর দিন স্বামী পিটার হগ তাঁকে উপহার দেওয়ার অজুহাতে স্থানীয় পোস্ট অফিসে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে হঠাৎ করেই তাঁর হাতে ডিভোর্সের আইনি নোটিস ধরিয়ে দেওয়া হয়। অভিনেত্রীর অভিযোগ, সেই সময় তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সামান্য অর্থ রেখে কার্যত তাঁকে রাতারাতি অস্ট্রেলিয়া ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। এই ঘটনার পর থেকেই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চরম আতঙ্কে দিন কাটাতে শুরু করেন।
প্রাণ হাতে অস্ট্রেলিয়া ছাড়ার ভয়ংকর রাত
সেলিনা জানান, ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর গভীর রাতে প্রতিবেশীদের সহায়তায় কোনওরকমে তিনি অস্ট্রেলিয়া ছাড়তে সক্ষম হন। তাঁর ভাষায়, অতিরিক্ত নির্যাতন এবং হুমকির মুখে পড়ে নিজের জীবন বাঁচাতেই এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু দেশ ছাড়ার পর থেকেই তাঁর সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ অভিনেত্রীর।
সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ
তিন সন্তানের মা সেলিনা জেটলি বলেন, বর্তমানে তাঁর সন্তানরা অস্ট্রেলিয়ায় বাবার কাছেই রয়েছে। পিটার হগ ইচ্ছাকৃতভাবে সন্তানদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সন্তানদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করা হচ্ছে এবং ভয় দেখানো হচ্ছে, যাতে তারা মায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে। সেলিনার দাবি, অস্ট্রেলিয়ার আদালত যৌথ হেফাজতের নির্দেশ দিলেও তাঁকে বারবার সন্তানদের কাছে যেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
গার্হস্থ্য হিংসা ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ
গত বছরের নভেম্বর মাসেই সেলিনা জেটলি স্বামীর বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য হিংসার অভিযোগে আদালতের দ্বারস্থ হন। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিয়মিত মারধর, অপমান এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অভিনেত্রী বলেন, একজন স্ত্রী হিসেবে ন্যূনতম সম্মান বা নিরাপত্তা তিনি কখনও পাননি।
জোরপূর্বক অস্বাভাবিক যৌনাচারের ভয়াবহ অভিযোগ
সেলিনার তোলা অভিযোগগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হল জোর করে অস্বাভাবিক যৌনাচারে বাধ্য করার বিষয়টি। তিনি জানান, স্বামী পিটার হগ নিয়মিতভাবে তাঁকে এমন যৌন আচরণে বাধ্য করতেন যা তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে। এর পাশাপাশি অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মীদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে তাঁকে চাপ দেওয়া হত বলেও অভিযোগ। সেলিনার দাবি, এসব করতে অস্বীকার করলে তাঁকে হুমকি দেওয়া হত এবং শারীরিক নির্যাতন করা হত।
ভয় দেখানো ও হুমকির অভিযোগ
অভিনেত্রী আরও বলেন, একাধিকবার তাঁকে ভয়ংকর হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমনকি ২০১২ সালের দিল্লির নির্যাতনের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে ভয় দেখানো হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। এই ধরনের হুমকি তাঁর মানসিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে দেয় এবং দীর্ঘদিন তিনি আতঙ্কের মধ্যেই দিন কাটান।
কেরিয়ার ও আর্থিক স্বাধীনতা ধ্বংসের অভিযোগ
সেলিনা জেটলির অভিযোগ, পিটার হগ পরিকল্পিতভাবে তাঁর কেরিয়ার এবং আর্থিক স্বাধীনতা নষ্ট করেছেন। অভিনয়ের কাজ থেকে তাঁকে দূরে রাখা হয়েছে এবং নিজের উপার্জনের ওপর কোনও নিয়ন্ত্রণ রাখতে দেওয়া হয়নি। অভিনেত্রী স্বামীকে ‘নার্সিসিস্টিক’ মানসিকতার মানুষ বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি তাঁর কোনও সহানুভূতি নেই।
প্রেম থেকে বিয়ে, তারপর অন্ধকার অধ্যায়
২০১১ সালে প্রেমের টানেই অস্ট্রেলিয়ার হোটেল ব্যবসায়ী পিটার হগকে বিয়ে করেন সেলিনা জেটলি। ২০১২ সালে যমজ পুত্র সন্তানের জন্ম দেন তিনি। পরে ২০১৭ সালে আরও যমজ সন্তানের জন্ম হলেও বিরল হৃদরোগে তাঁদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়। সেই শোক আজও তাঁকে তাড়া করে ফেরে বলে একাধিকবার জানিয়েছেন অভিনেত্রী।
লাইমলাইটের বাইরে থেকেও চর্চায় সেলিনা
দীর্ঘদিন অভিনয়জগৎ ও লাইমলাইটের বাইরে থাকলেও সেলিনা জেটলিকে নিয়ে আলোচনা থামেনি। কখনও পারিবারিক লড়াই, কখনও আইনি পদক্ষেপ—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন এখন এক কঠিন সংগ্রামের গল্প। কিছু মাস আগে আরবে আটকে থাকা ভাইয়ের জন্য দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তিনি। এবার নিজের দাম্পত্য জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সামনে এনে ন্যায়বিচারের লড়াইয়ে নামলেন অভিনেত্রী।
ন্যায়বিচারের আশায় সেলিনা জেটলি
সেলিনা জেটলির এই বিস্ফোরক অভিযোগ নতুন করে গার্হস্থ্য হিংসা ও নারীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একজন পরিচিত অভিনেত্রী হয়েও যদি এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়, তবে সাধারণ নারীদের পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে এই ঘটনা। এখন দেখার, আইনি লড়াইয়ের শেষে সেলিনা আদৌ ন্যায়বিচার পান কি না।


